সমাজে ইসলামিক বক্তাদের প্রভাব ও জনসংস্কৃতির তর্ক

আমিন আল রশিদ : ১. ইসলামিক আলোচকদের সামাজিক অবস্থানেও যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। কারণ তাদের অনেকের বক্তৃতা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাখ লাখ ভিউ ও শেয়ার হয়—যার মধ্য দিয়ে স্টার বা তারকা বিষয়ক ধারণায়ও পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ এখন শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষদের বাইরে এই আলোচকরাও তারকা হয়ে উঠছেন।
২. ইসলামিক ওয়াজের একটা অর্থনৈতিক মূল্যও দাঁড়িয়ে গেছে। আগে যেমন ওয়াজ করে শুধু নির্দিষ্ট বক্তা এবং যে প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে তিনি ওয়াজ করতেন, তারাই লাভবান হতো, এখন সেখানে একটি নতুন লাভবান গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা এসব বক্তব্য বা ওয়াজকে সম্পাদনা করে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
৩. গিয়াসউদ্দিন তাহিরীর আলোচনাগুলো ধর্মের বৃত্ত ছাপিয়ে ‘বিনোদনমূলক’ অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত হয় এবং জনাব তাহিরীও যতটা না ইসলামিক স্কলার বা আলোচক, তার চেয়ে বেশি তিনি এখন ‘সোশ্যাল মিডিয়া পারফরমার’ হিসেবে হিসেবে আর্বিভূত হচ্ছেন।
৪. ওয়াজের বিষয়বস্তুর সঙ্গে অন্যান্য উপাদান সংযুক্ত করা হচ্ছে। কখনও তা করা হচ্ছে বাংলা বা হিন্দি গান গেয়ে, আবৃত্তি করে বা গজলের সুরে। আবার ওয়াজে ব্যবহৃত জিকির ও গানগুলোয় মিউজিক লাগিয়ে এবং কিছুটা কাঁটছাঁট বা এডিট করে অন্য ফরম্যাটে ইউটিউবে প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এসব চালানো হচ্ছে।
৫. ইসলামি আলোচকদের অনেকে বক্তৃতার মধ্যে ইংরেজি প্রয়োগ করেন। সেখানে সম্ভবত মূল উদ্দেশ্য থাকে দর্শক শ্রোতাদের এটি বোঝানো যে, তিনি ইংরেজিও জানেন। এটি তাদের জানান দিতে হয় কারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণাটিই প্রবল যে, মাদ্রাসায় পড়া লোকজন ইংরেজি জানে না বা ইংরেজি কেবল সমাজের উচ্চবিত্তের ভাষা। ফলে আজহারির মতো বক্তারা শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা ও ইংরেজি বলার ব্যাপারে সচেতন। তাদের ভক্তরাও এটি পছন্দ করেন।
৬. অনেক রিকশাচালককে দেখেছি বুকপকেট মোবাইল ফোন রেখে তাতে এইসব ওয়াজ চালিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন। তার মানে এইসব ওয়াজে এমন কিছু কনটেন্ট আছে, যা তিনি শুনতে চান বা যা তাকে আকৃষ্ট করছে। এই জনগোষ্ঠী সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তার মানে সমাজের বিরাট অংশের মানুষের মধ্যে এইসব ওয়াজের প্রভাব রয়েছে।
৭. আদনান ত্বহা, মিজানুর রহমান আজহারি কিংবা গিয়াসউদ্দিন তাহিরির মতো আলোচকরা কেন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় হচ্ছেন? তারা কীভাবে সমাজের বিশাল অংশের মানুষকে আকৃষ্ট করছেন এবং সেই আকৃষ্ট হওয়া মানুষদের সামাজিক অবস্থান কী? তারা সবাই কি কম শিক্ষিত এবং তুলনামূলকভাবে দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে বসবাস করেন?
৮. সমাজে ইসলামাইজেশন যে বাড়ছে সেটি অস্বীকারের সুযোগ নেই। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হিজাব ও বোরখা পরা মেয়েদের সংখ্যা অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এই প্রবণতা বাড়ছে তার নির্মোহ বিশ্লেষণ করতে আমরা রাজি আছি?
৯. কারা ইসলামিক আলোচনা বা ওয়াজ শুনে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এবং কেন এসব আলোচক তারকা হয়ে উঠছেন বা উঠতে পারছেন। আমজনতার বিনোদন বা জনসংস্কৃতির সঙ্গে এর কি কোনও সম্পর্ক নেই?
১০. ইসলামিক আলোচকদের ওয়াজ বা বক্তৃতা যে পরিমাণ মানুষ শোনে, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য বা আলোচনা সেভাবে শোনে না। গ্রামের সাধারণ মানুষও তাদের মোবাইল ফোনে ওইসব ওয়াজ মাহফিল কপি করে নেন এবং কাজের ফাঁকে সেগুলো শোনেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.