ছোটগল্পঃ সৌজন্যে ধর্ষণ

 ছোটগল্পঃ সৌজন্যে ধর্ষণ

মিঠুন সরকার : আমাকে যখন প্রথমবার ধর্ষণ করা হয় তখন আমার বয়স ১১ বছর। কাজটি করেছিলেন আমার আপন এক ফুফা। আমি ব্যাপারটি মাকে জানালে আমার মা প্রচণ্ড জোরে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছিল। আর বলেছিল, “ফুফা আদর করে একটু কাছে নিয়েছে আর উনি না বুঝে বালছাল বকা শুরু করেছে। আর এই নিয়ে একটা টু শব্দ করলে জুতিয়ে মুখ ভেঙ্গে ফেলব”। আমিও আর এই নিয়ে কিছু বলিনি। তবে ঐ দিনের পর থেকে আমি অনেক রাতে মাকে গুঙিয়ে কাঁদতে শুনেছি। কারণ আমি মায়ের পাশেই ঘুমাতাম তখন।

আসলে আমার ফুফা ছিলেন প্রচণ্ড ধনী মানুষ। খুব ছোট একটা মুদির দোকান চালাতেন আমার বাবা। সংসার খরচের পর আমাদের পড়াশোনার খরচ চালানোটা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠত। তাই আমার বড় ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ ফুফাই দিতেন নিয়মিত। আর কখনো টাকার দরকার হলে উনার কাছে হাত পাতার লাইসেন্স দিয়ে রেখেছিলেন। আর সেজন্য আমাদের গোটা পরিবারটা ফুফার সামনে কুকুর হয়ে লেজ নাড়ত।

মা আমাকে চড় মারলেও ঐদিনের পর থেকে আমাকে আগলে রাখত। ফুফা আমার কাছে আসলে, নিয়ে যেতে চাইলে কোথাও যেকোন একটা ছুতোয় আমাকে মা সরিয়ে রাখত। আমার বাবাকে মা ব্যাপারটা বলেনি কখনো। কারণ এটা শুনে আমার বাবা আমাকে খুব বাজে ভাবে মারতে শুরু করবেন এটা মা জানত। বাবার চোখে ফুফা ছিলেন পরম শ্রদ্ধার মানুষ, যার কোন ভুল ক্রুটি থাকতে পারত না। ফুফা এলেই বাবা ঘাড় গুজে পাশে দাঁড়িয়ে তার সব কথা শুধু সায় দিত। বাবাকে তখন ঠিক একটা পোষা জানোয়ারের মত লাগত।

আমাকে দ্বিতীয়বার যখন ধর্ষণ করা হয় তখন আমার বয়স ১৯। এইবার কাজটি করে ঐ ফুফার ছেলে। আমি এইবারও কাঁদতে কাঁদতে মাকে গিয়ে বলি। কিন্তু আমার মা এইবার আর চড় মারেনি আমাকে, গালিও দেয় না। শুধু বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকে।

এই ঘটনার দেড় বছর পর মা মারা যায়। সবাই জানে আমার মা রক্ত স্বল্পতায় অনেকদিন ভুগে মারা গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানি আমার মা আত্নহত্যা করেছিল। একটু একটু করে নিজেকে শেষ করেছিল। একজন মা যখন তার সন্তানকে এভাবে শেষ হতে দেখলে নিরুপায় হয়ে শেষ উপায়ের দিকেই পা বাড়ায়। আমার ফুফার টাকাতেই আমার মায়ের চিকিৎসা না হলে হয়তো আমার মা আরও কিছুদিন বেঁচে থাকত।
আমার মায়ের মৃত্যুর পর আমি পরিবার থেকে বেরিয়ে আসি। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনাটা কোনভাবে চালিয়ে নেই। সিদ্ধান্ত নেই নিজের একটা পরিচয় দাঁড় করানোর জন্য। বাড়ির সাথে আমার তেমন আর কোন সম্পর্ক থাকলো না। তারাও বাঁচল, আমি বাঁচলাম।

তখন একটি ছেলের সাথে আমি সম্পর্কে জড়াই। ছেলেটি ছিল জীবনের সব বাস্তবতা থেকে উদাসীন। সেই বাস্তবতার মাঝে ধর্ষণ ব্যাপারটিও ছিল। আমি শুরুতেই ওকে সব বলে দিয়েছিলাম। কিন্তু ও সব শুনে শুধু বলেছিল, “এই বছর আমার লেখা কবিতার বইটা আমার নিজেরই কেমন সুবিধার লাগছে না। দেখা গেল তুমিই হলে একমাত্র ক্রেতা”। এমনভাবে কথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আসলে ওর এসব নিয়ে কোন মাথাব্যাথা ছিল না। কোনদিন এই নিয়ে একটা শব্দও ও বলেনি আমাকে। জীবনে পরপর দুটো নোংরা পশুর সংস্পর্শে আসার পরে এই ছেলেটি আমাকে নতুন করে দেখিয়েছিল, একটা মানুষ কতটা সুন্দর হতে পারে, হতে পারে কতটা পরিণত।

আমাদের বিবাহিত জীবনে ও কখনো আমাকে টাকা, সম্পত্তি দিতে পারেনি। আমার মত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা যেকোন মেয়ে কোন উচ্চবিত্তকে বিয়ে করত। আর সেই চাওয়াটা দোষের না। একটু ভাল থাকা, ভাল খাইতে চাইবার অধিকার সবার আছে। কিন্তু আমি ওকেই বিয়ে করেছিলাম। আসলে ওর চিন্তা, ওর দৃষ্টিভঙ্গ, ওর আচরণ বাধ্য করেছিল ওকে বিয়ে করতে। ও খুব ছোট একটা চাকুরী করত আর কবিতা লিখত। আমিও একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলাম। চলে যাচ্ছিল দিনগুলো।

আমাদের দুটি সন্তান হলো। দুটোই মেয়ে। মেয়েরা বড় হলে, স্কুলে ভর্তি হলে ও প্রায় ওভারটাইম করতে শুরু করলো। আমিও্ প্রচুর টিউশন ধরলাম। নিজেদের নিংড়ে দিতে চাইলাম তবুও কেউ যদি কিছু মাত্রা ছাড়িয়ে দিতে চাইত আমরা নিতাম না। কারণ জীবন যে হাতে ধরে শিখিয়েছে দানের পাত্রের নীচে মানুষ কি তীব্র বিষ লুকিয়ে নিয়ে আসে।

সেসময় একদিন জানতে পারলাম আমার সেই ফুফার অবস্থা আর আগের মত নেই। ফুফু আমি ছোট থাকতেই মারা গেছিলেন। ওনার ছেলেটিকে কারা যেন খুন করে ফেলে গেছে। ফুফা তখন বিছানায় পড়ে আছেন। একটু জল খাওয়ানোর কেউ নেই। বাবাকে মাঝে মাঝে দেখতে যাই। বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। আমার ভাই ফুফার টাকার মূল্য রেখেছে, আমাকে বার বার ধর্ষিত হবার মূল্য রেখেছে, আমার মায়ের আত্নহত্যার মূল্য রেখেছে। পড়াশোনা করে বিদেশে চলে গেছে। ওখানেই এক মেয়েকে বিয়ে করেছে। ভাল একটা চাকুরী করে। তবে এদেশে থাকা পরিবারের মানুষগুলোকে ও অতীত করে দিয়েছে একেবারে। অথচ এটা করার কথা আমার ছিল।

জীবনের অনেকটা পথ হেঁটে মাকে খুব মনে পড়ে মাঝে মাঝে। এই মহিলা ছিলেন প্রচণ্ড ভীতু। বাবাকে খুব ভয় পেত। কিন্তু তার ভয়ের থেকে আমার প্রতি ভালোবাসা বেশি ছিল সে প্রমাণ মা প্রাণের বিনিময়ে দিয়ে গিয়েছিল।

আমি আজকাল চারপাশ খুঁটিয়ে দেখি খুব। অনেক ছাত্র-ছাত্রী পড়তে আসে আমার কাছে। ওদের অনেক পরিবারগুলোয় আমি প্রায় আমার ফুফাকে দেখতে পাই, দেখতে পাই আমার ফুফাত ভাইকে। যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কিভাবে লালসার লালা নিয়ে ওত পেতে আছে। আত্নীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী কত রূপে ওরা আসে। আর আমার পরিবারের মত কতশত পরিবার কখনো কয়টা টাকা, কখনো মিথ্যে সৌজন্যতার জন্য তাদের সন্তানদের সেই লালসার অন্ধকূপে ছুঁড়ে ফেলে।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.