নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম চলে গেলেন চিরদিনের জন্য। আইন পেশায় থাকাকালীন তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনা করেছেন। ১১ বছর দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন মাহবুবে আলম। পাশাপাশি আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলেরও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পদাধিকার বলে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তার মৃত্যুতে দেশের আইনজীবী সমাজ, আইন অঙ্গন, সর্বোচ্চ আদালতসহ বিচারাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মাহবুবে আলম ১৯৪৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দ্রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও ১৯৬৯ সালে লোকপ্রশাসনে ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে (এলএলবি) ডিগ্রি অর্জন করেন মাহবুবে আলম।

আইনপেশা পরিচালনার জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৮০ সালে আপিল বিভাগে আইনপেশা পরিচালনার অনুমতি পান। ১৯৯৮ সালে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন মাহবুবে আলম। তিনি ১৯৭৯ সালে ভারতের নয়াদিল্লির ‘ইনস্টিটিউট অব কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ’ থেকে সাংবিধানিক আইন ও সংসদীয় প্রতিষ্ঠান এবং পদ্ধতি বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৯৮ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০০১ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত রাষ্ট্রের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাহবুবে আলম। তার আগে ১৯৯৩-৯৪ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৫-২০০৬ সালে সভাপতিও নির্বাচিত হন। মাহবুবে আলম ২০০৪-২০০৭ মেয়াদে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) হিসেবে নিয়োগ পান। তারপর থেকে টানা ১১ বছর তিনি এ দায়িত্বে বহাল ছিলেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মাহবুবে আলম। ভ্রমণপ্রিয় হিসেবে পরিচিত মাহবুবে আলম দেশ ও দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে বিভিন্ন সময় ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, হংকং, কোরিয়া ও তানজানিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ সফর করেছেন।

তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মামলায় যুক্ত ছিলেন। এছাড়া সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী মামলা পরিচালনা ছাড়াও আব্দুল কাদের মোল্লা, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মো. কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধীর মামলায় লড়েছেন মাহবুবে আলম।

আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মাহবুবে আলম। এছাড়া খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অবৈধ টাকা ফেরত আনার মামলাসহ তিনি রাষ্ট্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনা করেছেন এবং সফলতার সঙ্গে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মাহবুবে আলমের স্ত্রী বিনতা মাহবুব একজন চিত্রশিল্পী। তাদের দুই সন্তান। ছেলে সুমন মাহবুব, মেয়ে শিশির কণা। মাহবুবে আলম ছিলেন দেশের ১৩তম অ্যাটর্নি জেনারেল। তার আগে এত দীর্ঘ সময় আর কেউ এ দায়িত্ব পালন করেননি।

উল্লেখ্য, রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।

জ্বর ও গলাব্যথা নিয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর সিএমএইচে ভর্তি হন রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা। ওইদিনই করোনা পরীক্ষা করালে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ১৮ সেপ্টেম্বর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মাহবুবে আলমকে আইসিইউতে নেয়া হয়।

২০ সেপ্টেম্বর করোনা (কোভিড-১৯) পরীক্ষায় তার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। তবে শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় রাখা হয় আইসিইউতে।

তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এক শোকবার্তায় বলেন, ‘মরহুম মাহবুবে আলম বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা পরিচালনায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন একজন প্রথম সারির যোদ্ধা। তার মৃত্যু বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে এক অপূরণীয় ক্ষতি।’

এছাড়া মাহবুবে আলমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, ‌‘দেশের আইন অঙ্গনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মাহবুবে আলমের অবদান জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’
আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক কাজী নজীবুল্লাহ হিরু শোক প্রকাশ করে বলেন, তার মতো বিচক্ষন ব্যক্তি খুব কমই দেখা যায়। তিনি বড্ড অসময়ে চলে গেলেন।
এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় মাহবুবে আলমের মরদেহ সিএমএইচ থেকে বেইলি রোডের অ্যার্টনি জেনারেলের সরকারি বাসভবনে আনা হয়। ১২টায় নামাজে জানাজা শেষে তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.