হেফাজতে মৃত্যু :  রাষ্ট্রপক্ষ  চায় যাবজ্জীবন

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু : ‘যাবজ্জীবন’ চায় রাষ্ট্রপক্ষ
আইন প্রণয়নের সাত বছরের মাথায় হচ্ছে প্রথম রায়
১৮০ দিনে নিষ্পত্তির বিধান, তবে নিস্পত্তে ৬ বছর
সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন, অন্যূন ৫-৩ বছরের দণ্ড

নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়ন হয়। এ আইনে পুলিশের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর আদালতে একাধিক মামলাও হয়।
এ সব মামলার মধ্যে থানায় নিয়ে ইশতিয়াক হোসেন জনি নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে পল্লবী থানার তৎকালীন পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান জাহিদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে করা মামলা করা হয়। এ মামলার রায় আজ বুধবার ঘোষণা করা হতে পারে।
রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবী করেছেন।আজ এ রায় ঘোষনা করা হলে তা হবে ঐতিহাসিক। এটিই পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে প্রথম কোন মামলার রায়। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, রাষ্ট্রপক্ষ আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে আসামিরা খালাস পাবেন।
রায়ে কী আশা করেন— এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের প্রথম রায় ৯ সেপ্টেম্বর ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে। আসামি এসআই জাহিদসহ পাঁচজন। এই আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। রায়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তিই আশা করছি।

মামলার বাদী ও নিহত জনির ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি বলেন, ‘এসআই জাহিদ আমার ভাইকে থানায় নিয়ে আমার সামনে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমার ভাইয়ের কোনো অপরাধ ছিল না। আমি এসআই জাহিদসহ পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আশা করছি।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি রাষ্ট্রপক্ষ। রায়ে আসামিরা খালাস পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কি আছে আইনে-

নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রুনয়ন করা হয়।
এই আইনের বলা আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য নিষ্পন্ন করিতে হইবে। কোনো যুক্তিসংগত কারণে সময়সীমার মধ্যে মামলার বিচারকার্য সমাপ্ত করা সম্ভব না হইলে আদালত পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সমাপ্ত করবেন।” আরও বলা হয়েছে, “আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কাউকে হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু হলে এই আইেনর বিচার হবে।
এই আইনে আইনের ১৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি এই আইনের ধারা ১৩ এর উপ-ধারা (১) এর অধীনে র্নিযাতনের অপরাধ প্রমানিত হলে অন্যূন পাঁচ বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন । আর ১৫ (২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যদি পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন করে এবং উক্ত নির্যাতনের ফলে মৃত্যুবরণ করেন। তাহলে এই অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। একই সঙ্গে আদালত অর্থ দণ্ডো করেত পারেন।
এই আইনের ১৫ (৩) ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ সাধনে উদ্যোগী, সংঘটনে সহায়তা, প্ররোচিত ও সংঘটনে ষড়যন্ত্র করেন। তবে তঁার জন্য ওই ব্যক্তি দুই বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয় গত ২৪ আগস্ট।আদালত ৯ সেপ্টম্বর রায় ঘোষনার দিন র্নিধারণ করেন। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ২৪ জন সাক্ষিকে আদালতে্ উপস্থাপন করেছেন।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- পল্লবী থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল, এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু, সোর্স সুমন ও রাশেদ।
২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিরপুর-১১ নম্বর সেক্টরে স্থানীয় সাদেকের ছেলের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান চলাকালে পুলিশের সোর্স সুমন মেয়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। এ সময় জনি ও তার ভাই সুমনকে চলে যেতে বলেন। সুমন চলে গেলেও পরদিন এসে আবার আগের মতো আচরণ করতে থাকেন। তখন জনি ও তার ভাই তাকে চলে যেতে বললে সুমন পুলিশকে ফোন করে তাদের ধরে নিয়ে যান। তাদের নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকার লোকজন ধাওয়া দিলে পুলিশ গুলি ছোড়ে।

পরে থানায় নিয়ে জনিকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে জনির অবস্থা খারাপ হলে ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওই ঘটনায় ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে নির্যাতন ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহত জনির ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- পল্লবী থানার সাবেক এসআই জাহিদুর রহমান জাহিদ, এসআই আবদুল বাতেন, এসআই রাশেদ, এসআই শোভন কুমার সাহা, কনস্টেবল নজরুল, সোর্স সুমন ও রাসেল।

২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম মারুফ হোসেন পাঁচজনকে অভিযুক্ত এবং পাঁচজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্তকালে পুলিশের এএসআই রাশেদুল ও কামরুজ্জামান মিন্টুকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান জাহিদ, এএসআই রাশেদুল, এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু, সোর্স সুমন ও রাশেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.