লঞ্চ র্দুঘটনা ও প্রাণহানির দায় কার
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
স্বাধীনতার পর গত ৪৪ বছরে ৭৩২টি নৌ দুর্ঘটনায় ১০ হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত হয়েছ, মামলা হয়েছে। এসব র্দুঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩২টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু বিচারে অপরাধের শাস্তি খুবই নগণ্য।
লঞ্চ ডুবে মানুষের মৃত্যু এ দেশে নতুন নয়। আর লঞ্চডুবির ঘটনার পর পরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সময়ের প্রয়োজনে কখনো এক বা একাধিক কমিটি গঠন করা হয়। এই তদন্ত কমিটিতে চাপা পড়ে যায়। মানুষ ভুলে যায়। তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনও কখনো প্রকাশ করা হয় না। দোষীদের শাস্তির দিতে দ্রুত আইননানুগ ‌ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় না। আবার তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলেও প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
অতীত ঘটনার তদন্ত সূত্র ধের জানা যায়, এসব তদন্ত কমিটির প্রায় কোনো সুপারিশই বাস্তবায়িত হয়নি। বেশির ভাগ কমিটির তথ্যই অপ্রকাশিত থেকে গেছে। তাই শাস্তিও পান না দায়ী ব্যক্তিরা।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাব বলছে, ১৯৭৬ সাল থেকে গত ৪৪ বছরে ৭৩২টি নৌ দুর্ঘটনায় ১০ হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনায় ৫৩২টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়েছে। দুর্ঘটনার তদন্তে কমিটির সুপারিশ । কাগুজে সুপারিশই থেকে গেছে। তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি।
২৯ জুন সদরঘাটে ময়ূর-২ নামের আরেকটি লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায় মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড নামের একটি ছোট লঞ্চ। ওই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার শিকার মর্নিং বার্ড লঞ্চটি উদ্ধার করা হয়েছে। লঞ্চের ভেতর লাশের সন্ধান না পাওয়ায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ।
এ ঘটনায়ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাত সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের মনে হয়েছে, ছোট লঞ্চ মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে ময়ূর-২।

এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার মামলা হয়েছে ময়ূর-২ নামের লঞ্চটির মালিকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে। গত ৪৪ বছরে ৭৩২টি নৌদুর্ঘটনায় ৫৩২টি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে এসব তদন্ত কমিটির সুপারিশ প্রায় বাস্তবায়িত হয়নি বললেই চলে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি ও বেসরকারি একাধিক সংস্থা এসব তথ্য জানিয়েছে।
নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্যসচিব আমিনুর রসুল সাংবাদিকদের বলেন, ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট পদ্মায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। ওই ঘটনায় কারও শাস্তিই হয়নি। তাঁর অভিযোগ, লঞ্চ দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটির কোনো সুপারিশই বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝেমধ্যে প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নামমাত্র জরিমানা করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শান্তি হয়নি।
২০১২ সালে মেঘনায় এমভি শরীয়তপুর ডুবে গেলে দেড় শতাধিক যাত্রী মারা যান। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কারও শাস্তি হয়নি।
২০০২ সালে এমভি সালাউদ্দিন-২-এর দুর্ঘটনায় প্রায় চার শ যাত্রী নিহত হন। ওই দুর্ঘটনার অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তিসংক্রান্ত ফাইল গায়েব হয়ে যায়। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চের মালিকের শাস্তি সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
২০০৩ সালে এমভি নাসরিন দুর্ঘটনায় আট শতাধিক যাত্রীর প্রাণহানি হয়। তদন্ত কমিটি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চাকরিচ্যুত করা এবং মালিকের লঞ্চটির নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সুপারিশ মানা হয়নি।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ওভারনাইট কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু নৌপরিবহন সেক্টরে অনেক সুপারিশ বাস্তবায়ন করছি। অনেক ডেভেলপ করা হচ্ছে। আনফিট লঞ্চ আস্তে আস্তে ক্লোজ করে ফেলছি। সেক্টরটি একটি সিস্টেমে আনা হবে।’
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ আইএমওর (আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন) সদস্যভুক্ত দেশ। এভাবে নৌযান দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানেও দেশটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার প্রতিদিন২৪.কম কে বলেন, প্রতিটি র্দুঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে র্দুঘটনার কারণ এবং সুপারিশ করে থাকেন। তার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হলে র্দুঘটনা অনেকটাই সম্ভবভ।
তিনি আরো বলেন, মামলা হয়, কিন্তু অপরাধী দৃষ্টান্ত মুলক সাজা হয়েছে। এমন কোন দৃষ্টান্ত নেই। মামলাগুলাে সঠিকভাবে তদন্তো হয়না। যে কারনে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যায়। একটি র্দুঘটনা ঘটে কারো না কারো অবহেলা হয়েছে। বিচার শেষে দেখা যায়, আসামি ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। তবে ধরে নিতে হবে, র্দুঘটনাই ঘটেনি। এই দায় আদালতের নয়, প্রসিকিউশন আর তদন্ত সংস্থার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.