সৈয়দ ফাইজ আহমেদ : মতিঝিল শাপলা চত্ত্বর থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, গুগলের হিসেবে ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার পথটুকু বাসে চেপে পাড়ি দিতে আজকে সময় লাগলো ৩ ঘন্টা ১০ মিনিট।

না, ঢাকার অসহ্য ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে আলাপ না, আলাপ এই জ্যামে থাকা মানুষগুলোকে নিয়ে।

সিটিং বাস হলেও, অফিস শেষের বাড়তি চাপে বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলেন বেশ কয়েকজন মানুষ। ফেদেরিকো ফেলিনি কিংবা জিগা ভের্তভের স্টাইলে চোখটাকে ক্যামেরা করে নিলে দেখা যেতো যে, চশমা পড়া, মোটামুটি পোষাকের লোকটির চেহারায় বিষন্নতা। সারাদিন অফিস শেষে বাড়ি যাবার সময়েও এই নিদারুন কষ্ট মানিয়ে নেয়ার প্রানান্ত চেষ্টা।

পরিপাটি পোষাকের এক নারী ক্লান্ত হয়ে সিটে বসেই বারবার সামনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছিলেন, সারাদিন কাজের পর আবার হয়তো বাড়ি গিয়ে উনাকে ঘরের কাজ সারতে হবে।

পেছন দিক থেকে চিৎকার করে ফোনে কথা বলা লোকটি কাকে জানি পাওনা টাকার জন্য গালাগালি দিচ্ছিলেন, আর সামনে বসা এক লোক অসহায় হয়ে ফোনে বললেন, খুব জ্যামে পড়ছি রে মা! এইতো বাবা চলে আসছি!

এদের দেখতে দেখতেই চোখ গেলো পাশের বাসের দিকে। লোকাল বাসটিতে লোক গাদাগাদি করে দাঁড়ানো, এরই মধ্যে কেবল দেখা গেলো, দাড়িওয়ালা এক ক্যানভাসার নিজের পণ্য বিক্রির চেষ্টা করছে। অতোদুর থেকে কিচ্ছুটি শোনা গেলো না। এতে একটা সিনেমা ধরনের ভাব আসলো। পর্দার দর্শক যেন দেখতে পাচ্ছেন উনার ঠোঁট নাড়ানো আর হাসিমুখ, যদিও এর আড়ালের উৎকণ্ঠা আর অবসাদ চোখ এড়ায় না।

কি এক ভয়াবহ কনক্রিটের নরক! এই প্রতিটা মানুষই নিজের, নিজের পরিবারের একটু স্বচ্ছলতার জন্য এই নরকে লড়াই করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অথচ, এই করতে গিয়ে নিজেকে বা প্রিয় মানুষগুলোকেই সময় দিতে পারছেন না।

অথচ আমাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমাদের আরো বেশী বেশী উপার্জন করে, আরো বেশী অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার প্রতিযোগীতায় উৎসাহ দেয়। এই ফালতু প্রতিযোগীতার মোহে একধরনের স্বেচ্ছা নরকবাসে পড়েও হুশ হয়না।

না, চরম দারিদ্র্যর আলাপটা হচ্ছে না। যেই মা তাঁর শিশুর জন্য খাবার কিনতে পারেন না নিয়মিত, তাঁর জন্য অর্থ খুব জরুরী, কিন্তু যে মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারে তাঁর জন্য এই প্রতিযোগীতায় নামা একধরনের ফাঁদ।

প্রশ্ন আসবে, তবে কি প্রবৃদ্ধির চাকা থেমে যাবে? উত্তর হচ্ছে, প্রবৃদ্ধির চেয়ে জীবন বেশী জরুরী। যেই জীবন যাপনের, উদযাপনের। কঞ্জুমারিজম যেই প্রবৃদ্ধি ঘটায় এতে যাপন নাই, উদযাপন নাই। উপরন্তু এই প্রবৃদ্ধির শেষতক অমোঘ ফলাফল হচ্ছে অসাম্য। লাখো লাখো মানুষের নরকযাপনের বিনিময়ে গুটিকতকের পণ্যস্বর্গ লাভ।

তাই, প্রথমে কঞ্জুমারিজমকে প্রশ্ন করা জরুরী। হাতের মোবাইল ফোনটা একটু কম দামী হলে যেই সামাজিক লজ্জায় পড়তে হয় কিংবা গাড়িতে চেপে আসা যাওয়ায় বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের নিচে থাকার আরামের চেয়ে আপনজনের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো অনেক বেশী প্রশান্তির, অনেক বেশী আকাংখিত কিনা এই আলাপটা বোঝা জরুরী।

কঞ্জুমারিজমের নানা কৌশলে এই ফাঁদ কেটে পার হওয়া কঠিন। কিন্তু, নিজের জন্য, অনাগত ভবিষ্যতের জন্য, পৃথিবীর জন্য এই লড়াই ভীষন জরুরী।

এখনকার যুগ হয়ে গেছে ডিসপোসেবল এর যুগ।আমরা কাঁচের বোতলের বদলে এককালীন প্লাষ্টিক ব্যাবহার করি। ফ্যাশনের মোহে, নেশায় বছর বছর, মাসে, মাসে ফোনের মডেল, গাড়ির মডেল অপ্রয়োজনীয় জিনিসের স্তুপ করি। এই ডিসপোসেবল মনোভাব কিন্তু আমাদের মানূষে মানূষে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। আমাদের এই একবিংশ শতকে সম্পর্কগুলোতে গভীরতা নাই। কঞ্জুমারিজমের ডিসপোসেবল আর এবান্ডান্স আমাদের গভীরতাহীন, চিন্তাহীন জম্বি বানিয়ে দিচ্ছে। এই নেশা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।

আর মানুষের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়নের সুষম বন্টন জরুরী, কেননা এই প্রবৃদ্ধি, এই উন্নয়ন মানবজাতির সামগ্রিক অবদান, প্রকৃতিকে ব্যাবহার করে উৎসারিত।

অভাবের পৃথিবী থেকে প্রাচুর্যের পৃথিবীতে এসে চিন্তাহীন লোভের বদলে জীবনকে, পৃথিবীকে ভালোবাসতেই হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.