স্টাফ রিপোর্টার : নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠের সহিংসতা ছাড়াও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ প্রতিরোধে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকায় ১৬টি মামলায় অন্তত ৭২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অপরাধের আশঙ্কা যেমনটি করা হয়েছিল সেরকম ঘটছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গুজব, অপপ্রচার, বিকৃত ছবি ও ভিডিও প্রচার রোধে কনটেন্ট বা ইনফরমেশন ফিল্টারিংয়ের (পোস্ট, স্ট্যাটাস সরিয়ে বা মুছে ফেলা) উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে কোনো ‘আপত্তিকর’ পোস্ট দিলে বা গুজব ছড়ানোর মতো কোনো তথ্য প্রকাশ করলে তা দ্রুত সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে পুলিশ। একইসঙ্গে যারা এগুলো করছেন তাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের শেষ সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সক্ষমতা বাড়াতে এক হাজার ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়।

ইসির পর্যবেক্ষণ টিম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ঠেকাতে পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে ৮ সদস্যের পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব এসএম আসাদুজ্জামান।

এই টিমের প্রধান হচ্ছেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুল ইসলাম। অন্যদের মধ্যে পুলিশ সদর দফতর, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র‌্যাব, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি), ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) একজন করে প্রতিনিধি এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন।

এই টিম নির্বাচন সংশ্লিষ্ট গুজব, প্রপাগান্ডা, যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে; এমন কার্যক্রম বন্ধের লক্ষ্যে ২৪ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং করছে। তারা নির্বাচনবিরোধী কোনো গুজব কিংবা অপপ্রচার পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট দফতরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

চলতি ডিসেম্বরে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত ফেসবুকের ৬টি একাউন্ট ও ৯টি পেজ বন্ধ এবং ১৫টি টুইটার একাউন্ট বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠান দুটি।

টুইটার জানিয়েছে, তাদের বন্ধ করা আইডিগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ফেসবুক বলছে, এগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনে বিভিন্ন কনটেন্ট পোস্ট করা হচ্ছিল এবং এর সঙ্গে সরকার-সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের সম্পর্ক আছে।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের আন্তর্জাতিক সংগঠন আইসাকার ঢাকা চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি একেএম নজরুল হায়দার বলেন, ইন্টারনেটে শুধু সরকারবিরোধীরা যে গুজব ছড়ায় তা নয়, ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়ও গুজব ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। যেকোনো ধরনের মিথ্যা তথ্যই সমাজের জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় কোনো পক্ষ থেকেই তা কাম্য নয়।

তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণমাধ্যমকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে তা সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।

১৬ মামলায় গ্রেফতার অন্তত ৭২

পুলিশের সাইবার অপরাধ প্রতিরোধক বিষয়ক বিভিন্ন দল সম্প্রতি কমপক্ষে ১৬টি মামলায় ৭২ জনকে গ্রেফতার করেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ানোর অভিযোগে গত এক মাসে ঢাকা শহরে ১১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার অপরাধ তদন্ত কেন্দ্রের তথ্যমতে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় ২৫০টি আইডি সনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো- মিথ্যা তথ্য, গুজব, বিশেষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অশ্লীল প্রচারণা উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে অন্তত ১০ জন।

সিআইডির সনাক্ত করা আইডিগুলোর মধ্যে বিদেশে অবস্থান করছেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। তাদের মধ্যে সৌদি ও কাতার প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। তাদের বিষয়ে প্রথমে দেশে অবস্থানকারী পরিবারের সদস্যদের তলব করা হচ্ছে। তারপরও বন্ধ না হলে পাসপোর্টের তথ্য সংগ্রহ করে ইমিগ্রেশন পুলিশকে জানানো হচ্ছে যেন দেশে ফেরা মাত্রই গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া ভবিষ্যতে অপরাধের মাত্রার ওপর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসকে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, গত তিন মাসে ইন্টারনেটে রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ৪০-৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাইবার অপরাধ তদন্ত কর্মকর্তাদের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিল সেভাবেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হচ্ছে না। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.