আনন্দ কুটুম : 

‘পাঠশালার’ অনিয়মের কথা আজ প্রথম যারা শুনলেন তারা একটু নড়েচড়ে বসুন। শহীদুল আলমের ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিস্ঠিত ক্রিয়েটিভ ইন্সটিটিউট পাঠশালার অনিয়মের কথা বহু পুরাতন। কিন্তু যেহেতু প্রতিষ্ঠানটা ব্যক্তি মালিকানাধীন, সুতরাং আমাদের খুব বেশি কিছু করারও ছিলো না। এ নিয়ে পূর্বে মানব বন্ধন হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে, ঘরে-বাইরে বহুত আলাপও হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানই ছিলো নিরব।

আজ যখন শহীদুল আলমকে অন্যায় ভাবে আটক করা হয়েছে আজ কিছু সুযোগ সন্ধানী উঠে পড়ে লেগেছে পাঠশালার পেছনে। প্রশ্ন হল যে শিক্ষামন্ত্রী আজ বিবৃতি দিচ্ছেন যে এই প্রতিষ্ঠান অবৈধ, তিনি এতোদিন কোথায় ছিলেন? দুইদিন আগেই শুনলাম ঢাকা ভার্সিটির সাথে পাঠশালার চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে এখন থেকে পাঠশালার কোর্সকে অনার্স সমমান দেওয়া হবে এবং এটা দেবে ঢাবি। এ নিয়ে সংবাদও হয়েছে। আজ শুনছি ঢাবিও ঢাক পেটাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান অবৈধ।

পাঠশালার সাথে জয়েনভেঞ্চারে কাজ করেনি এমন প্রতিষ্ঠান খুব কম। পাঠশালা যদি অবৈধ হয়ে থাকে তাহলে এর সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করা প্রতিটা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্টিফিকেট কোর্স কেবল পাঠশালা একাই করায় না। এমন শিক্ষাক্রম পরিচালিত প্রতিষ্ঠান দেশে কয়েক ডজন। তাদের অনুমোদনও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষামন্ত্রীকেও আইনের আওতায় আনা হোক যে কেন এতোদিন তিনি পাঠশালার বিষয়ে কোন একশন নেন নাই।

শুক্র শুক্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিটিআই এর বয়স ৮ দিন। বিএফআই, পাঠাশালা, মুভিয়ানা এই প্রতিষ্ঠান গুলোই এতোদিন এদেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কাজ করে গেছে। পাঠশালা ব্যতীত আর কোন কোন প্রতিষ্ঠান ফটোগ্রাফি শেখায় দেশে জানা নেই। এবং আজ যেহেতু কথা উঠেছে সুতরাং সরকারকে এটাও জানাতে হবে যে এই ফোটোগ্রাফী, ক্যালিগ্রাফি, পেইন্টিং রিলেটেড ছোট ছোট ওয়ার্কশপের অনুমোদন সরকারের কোন মন্ত্রনালয় দেবে এবং কি প্রকৃয়ায় দেবে।

কেরো দিকে আঙ্গুল তোলার আগে সরকারের নিজের উচিৎ নিজের দিকে আঙ্গুল তোলার। ৪৭ বছর হয়ে গেছে এখনো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কোন শিক্ষা ব্যবস্থা এদেশে গড়ে ওঠেনি। যেখানে সিস্টেমই নেই অনুমোদন নেওয়ার, সেখানে অনুমোদনের প্রসঙ্গটাই অমূলক।

এদেশে এমনিতেই শিল্প সাহিত্য চর্চার কোন স্পেস নেই। স্বাধীনতা তো নেইই। কিছু একটা করতে চাইলেই রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি থাকতে হবে। অন্যথায় হবে না। শিল্প চর্চা একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। সেই মরুভূমিতে পাঠশালা আমাদের মত তরুণদের জন্য সামান্য পথ প্রদর্শক। এখন হায়েনারা উঠে পরে লেগেছে পাঠশালায় আগুন দিতে।

পাঠশালার নিয়মহীনতার জন্য শহীদুল আলমের শাস্তি প্রাপ্য হলে সেই শাস্তি তাকে দেওয়া হোক। কিন্তু তার ফ্রিডম অব স্পিচ ব্যহত করার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এবং সেই সাথে সরকারি হনুদের বলতে চাই যে আগে পাঠশালার সমকক্ষ কিছু একটা স্থাপন করেন, তারপরে পাঠশালায় আগুন দিয়েন।৷

দিনে দিনে এদেশের সব কিছু নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে। এখন পাঠশালা আর দৃকের পেছনে লাগা হয়েছে। অথচ আমরা জানি যে আমাদের জীবনে দৃক এবং পাঠশালার ভূমিকা কি। এইটুকু বোঝার ক্ষমতা দলকানা আমলাদের নেই আমরা জানি।

শিল্প সাহিত্য কালচার রক্ষায় কম বেশি সব দেশেই স্পেশাল এক্ট থাকে। দাবি উঠুক এদেশেও স্পেশাল কালচারাল এক্ট চাই। এই এক্টের আওতায় দেশের শিল্পী সাহিত্যিক প্রত্যেকের শিল্প চর্চার অধিকার সংরক্ষিত হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে একজন মিলিটারি যেমন আর দশটা সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা বলেই তার বিচার হয় আলাদা আদালতে, আলাদা আইনে। তেমনি শিল্পীরাও সমাজের আর দশটা সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা। তাদের ভাবনা, চিন্তা, এক্সপ্রেস করার ক্ষমতা ভিন্ন, আঙ্গিকও ভিন্ন। সুতরাং তাদের বিচার আচারও হতে হবে স্পেশাল আইনে, স্পেশাল আদালতে। পাঠশালা বিতর্কের মধ্য দিয়ে সূচিত হোন নতুন আলোর দিন। যে স্বাধীন দেশে একজন শিল্পীর নিজেকে এক্সপ্রেস করার স্বাধীনতা থাকে না, সেই অদ্ভুত স্বাধীন দেশ লইয়া আমরা কি করিব?

সূত্র : লেখাটি লেখকের ফেসবুক দেয়াল থেকে নেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.