নিজস্ব প্রতিবেদক : নিরাপদ সড়কের দাবিতে চার দিন ধরে স্কুল-কলেজের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। বুধবার (১ আগস্ট) সকাল থেকেই নগরীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এদিন রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যাও ছিলো কম। বিক্ষোভ-অবরোধ আর শিক্ষার্থীদের মিছিল সমাবেশে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে নগর।

রাজধানীর শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, রামপুরা, সাইন্সল্যাব, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, পল্টন, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মিছিল-সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’— এমন সব স্লোগানে তারা মুখর করে রেখেছে রাজপথ।

রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ রামপুরা-ডিআইটি সড়ক অবরোধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অবরোধে এ সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে গেলে রাস্তায় বের হওয়া মানুষ হেঁটেই গন্তব্যে রওয়ানা দেন। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে কর্মজীবীরা ‘ন্যায্য আন্দোলন’ বলেই মন্তব্য করছেন।

বুধবার (১ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে আইডিয়াল স্কুল, বনশ্রী শাখার শিক্ষার্থীরা বিশাল মিছিল নিয়ে রামপুরা ব্রিজে এসে সড়ক অবরোধ করে। এরপর সেখানে এসে যোগ দেয় রাজধানী আইডিয়াল স্কুল, একরামুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ইমপেরিয়াল কলেজ, গুলশান কমার্স কলেজসহ এ এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজারখানেক শিক্ষার্থী।

এ সময় ডিআইটি সড়কে গণপরিবহন কম থাকলেও প্রাইভেট গাড়ি কিংবা সিএনজি-রিকশার যাত্রীরা আটকা পড়েন। মোটরসাইকেল চলাচলও বন্ধ করে দেয় শিক্ষার্থীরা। তবে অফিস কিংবা কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি হলেও শিক্ষার্থীদের এমন প্রতিবাদ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে শোনা যায়নি। উপরন্তু অনেক অভিভাবককে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘ন্যায্য’ বলেই অভিহিত করছেন।

আকলিমা খাতুন নামের এক গৃহিণী তার স্কুলপড়ুয়া ছোট বাচ্চার হাত ধরে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাচ্চারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে, সেখানেও গাড়ি উঠিয়ে তাদের মারবে- এটা কোন দেশ।’

প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন স্লোগানের ব্যানার-ফেস্টুন চোখে পড়ছে। সেখানে তারা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগসহ নিরাপদ সড়কের দাবি জানাচ্ছে।

রাজধানীর আইডিয়াল কমার্স কলেজ, তেজগাঁও কলেজ ও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছে বাংলামোটর মোড়ে। শাহবাগ ও বাংলামোটর মোড় ঘিরে সবগুলো রাস্তাও বন্ধ।

অন্যদিকে, মতিঝিল মডেলর স্কুলের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছে দৈনিক বাংলা মোড়ে। চারপাশে ব্যারিকেড দিয়ে যানচলাচল বন্ধ রেখেছে তারা। অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া কোনো গাড়ি চলাচল করতে দিচ্ছে না। এর মধ্যে বিকল্প পরিবহনের একটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে এই এলাকায়।

রাজধানীর উত্তরা-এয়ারপোর্ট রোডেও রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে এয়ারপোর্ট থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এসময় শিক্ষার্থীদের অবরোধ এড়িয়ে যেতে চাইলে এয়ারপোর্ট মোড়ে প্রজাপতি পরিবহনের দুই গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

মোহাম্মদপুরেও শিক্ষার্থীরা সকালে মিছিল বের করেছে।

সকাল ৭টার দিকে কাঁচপুর সড়কেও মিছিল-অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। সেখানে এক শিক্ষার্থীকে চাপা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সকাল থেকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, মিরপুর ২ নং ওভারব্রিজ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ছাত্র জমায়েত শুরু হলেও দুপুর ১২টার পর থেকে ছাত্ররা মিরপুর ১০ এ লাগাতার অবস্থান নেয়।

পুলিশ জানায়, মিরপুর ১০ নং গোল চত্ত্বরে সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে মিরপুর বংলা কলেজ, মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা কমার্স কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।


দনিয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের ধাওয়া

এদিকে শনি আখড়ার দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া দেয় সাদা পোশাকের কয়েকজন কর্মী। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে, তারা যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। পুলিশ তাদের কিছুই বলেনি। এ ছাড়া শনি আখড়ায় একটি পিকআপ চাপায় শিক্ষার্থী নিহতের গুঞ্জনে আবারও উত্তাল হয় রাজপথ। তবে ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) কিংবা যাত্রাবাড়ীর কোনো স্থানীয় হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পুলিশের কাছেও কোনো তথ্য নেই বলে দাবি করেছে পুলিশ।

চারদিনের এমন আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। অপরদিকে দুই শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার জাবালে নূর গাড়ির চালক মাসুম বিল্লাহকে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তার গাড়ির চাপাতেই ওই দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়।

শিক্ষার্থীরা নয় দফা দাবি জানিয়েছিল। তাদের এই দাবি যৌক্তিক উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দাবিগুলো বাস্তবায়নে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আর এমন পরিস্থিতির মধ্যে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ার ভেটিং (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত নথি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। বুধবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম এ তথ্য জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.