বিশেষ প্রতিবেদন : সুন্দরবনের বাঘ শুমারি প্রায় শেষ। বনের ৩৬ ভাগ এলাকার ক্যামেরা ট্র্র্যাপিং করে শাবকের ছবি দেখা গেছে। বাঘের সংখ্যা বাড়ার সুখবরের চূড়ান্ত ঘোষণা ডিসেম্বরে দিচ্ছে বন বিভাগ। ভারত, নেপাল, ভুটানের সাথে যৌথভাবে চালনো প্রথম এই জরিপে মিলবে বেঙ্গল টাইগারের সবশেষ তথ্য -উপাত্ত। এই দিকে সুন্দরবনের পাশাপাশি পাবর্ত্য চট্টগ্রামের গহীন বনেও বাঘ খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন প্রাণী গবেষকরা।

২০১৫ সাল থেকে বনের খাল আর বাঘের বিচরণ ক্ষেত্রগুলো নজরদারি করছে বন বিভাগ। এবার আর পায়ের ছাপ অর্থাৎ পাগমার্ক দেখে নয় ; বাঘের ছবি তুলে গোনা হচ্ছে সংখ্যা। পূর্ব সুন্দরবন এলাকার প্রতি দুই কিলোমিটার পরপর বসানো হয়েছে ক্যামেরা। আর এতে বেশ কিছু বাঘ শাবকের ছবি পাওয়া গেছে।

বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির বলেন, ১৯৭৫ সালে প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে বাঘ জরিপ করেন জার্মান প্রাণী গবেষক, হেন রিডসে। তখন ৩৫০ টি বাঘের খবর জানা যায়। ২০০৪ সালে পাওয়া যায় ৪৪০ টি বাঘ। কিন্তু দুই বছর আগে জানা যায় পূর্ব ও পশ্চিমের ২৬ ভাগ এলাকায় বাঘ আছে ১০৬টি। সেবার কিছু ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও পায়ের ছাপ দেখে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এবার শুধু ট্র্যাপিং নির্ভর জরিপ হয়েছে।

জাহিদুল কবির আরও জানান, পায়ের ছাপের থেকে ক্যামেরা ট্র্যাপিং বেশি নির্ভরশীল ও বিজ্ঞানসম্মত। ইউএসএআইডি’র অর্থ সহায়তা জরিপে কাজ করছে বন বিভাগ। বনের খাল, খাড়ি, বিচরণ এলাকার মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ । এখন ছবি দেখে গণনার কাজ চলছে। দুই বছর আগে প্রাপ্ত ১০৬টি বাঘের চেয়ে এবারের জরিপে সংখ্যা বাড়বে।

সুন্দরবনের ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটির গভীর বনেও নাকি বাঘের দেখা পাওয়া গেছে। ২০১১ সালেও পাহাড়ের ছড়ার ধারে পায়ের ছাপ দেখা গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক মনিরুল এইচ খান বলেন, ৫০ বছর আগে রাজধানীর কাছে ভাওয়ালের বন থেকে বাঘ হারিয়ে গেছে। কিন্তু পাহাড়ে বাঘ আছে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায। সেখানে আদিবাসীদের কাছে বাঘের সংরক্ষিত চর্বি দেখেছেন তিনি। তবে পাহাড়েও খাবারে সংকট থাকায় সংখ্যাটাও খুব কম। তাই সুন্দরবনের পাশাপশি, পাহাড়ে বাঘের জরিপ করা উচিত।

বাঘের জিনোম আবিষ্কার: পৃথিবীতে একমাত্র নোনা পানি খেয়ে বেঁচে আছে বেঙ্গল টাইগার। দুনিয়ার সব শ্বাসমূল বনের মধ্যে কেবল সুন্দরবনেই রয়েছে বাঘ। শ্বাপদসংকুল এই ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারের বনে কিভাবে টিকে আছে বাঘ তা এখনও অজানা। বনের বাইরে মানুষের বাজারে বেঙ্গল টাইগারের দরটা বেশ চড়া। দেশের বাহিরে পাচার হওয়া বাচ্চা ও চামড়া আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে উদ্ধার হলে জিনোম সিকোয়েন্সের নমুনা প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হওয়া তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছেনা।

অধ্যাপক মনিরুর এইচ খান বলেন, ভারত ও নেপালে বাঘের জীবন চিত্র আবিষ্কার সফল হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও  কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যেহেতু ঢাকা চিড়িয়াখান ও কক্সবাজার ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে তিনটি সুন্দবনের বাঘ আছে। তাই জিনোম আবিষ্কারে খুব একটা কষ্ট হবেনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নূর জানাহান সরকার বলেন, দ্রুত জীবন রহস্য উদঘাটন না করতে পারলে বাঘের ভৌগলিক মালিকানাও হারাতে পারে বাংলাদেশ।

বাঘ রক্ষায় নেওয়া প্রকল্প: সুন্দরবনের নোনা পানির বাঘ রক্ষায় এশিয়া ও ইউরোপের দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে বাংলাদেশে। চার বছরে মেয়াদে ইউএসএআইডির দেযা ১০৪ কোটি টাকার সাথে বাংলাদেশ সরকারের ১০ কোটা টাকা যোগে ১১৪ কোটি টাকায় পরিচালিত হচ্ছে- বাঘ প্রকল্প।এর আওতায় দেশ জুড়ে বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করেছে।

২০১৮ থেকে  ২০২৮ সাল পর্যন্ত টাইগার একশন প্ল্যান নামে দশ বছর মেয়াদে একটি প্রকল্প নিয়েছে বন বিভাগ। কিন্তু সেসব উদ্যোগ খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। যার প্রমাণ পাওয়া যায় এ বছর জানুযারিতে একটি বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটে। সুন্দরবনের গুলিশাখালি গ্রামে একটি বাঘ পিটিয়ে মেরে ফেলে গ্রামবাসী।

পাশেই বন বিভাগের ক্যাম্প থাকার পরও ট্রাংকুলাইজআর গান ( অচেতন করবার বন্দুক) না থাকায় বাঘটাকে স্থানীয়দের কাছ থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বন বিভাগের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য আনুযায়ী, গত ১৮ বছরে ৫০টি বাঘ মারা গেছে । যার অর্ধেকের বেশি মেরেছে মানুষ। নতুন এলাকা ও খাবারের সন্ধানে বন থেকে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় স্থানীয়দের পিটুনিতে মারা যায় বেঙ্গল টাইগার।

সুন্দরবন ও বাঘ গবেষক, খসরু চৌধুরী বলেন, বন বিভাগের কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। কোন এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে জনবলের আভাবে ঘটনাস্থলে লোক পৌঁছাতে সময় লাগে। অথচ এই প্রাণীটি রক্ষায় শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। সুন্দরবনের মত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজর প্রধান প্রাণী রক্ষায় প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নজরদারি করা উচিত।

বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ: বাঘ হত্যায় বনদস্যুদের দায় প্রায় শতভাগ। চোরাকারবারিদের চাহিদা অনুযায়ী বনের গভীরে বাঘ হত্যা করে তারা। তবে প্রায় দুই বছর ধরে বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ করায় বাঘ হত্যা কিছুটা কমেছে। বনদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ চালান যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মহসিন উল হাকিম । তাদের অনেকেই সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন।

সুন্দরবনে ঘন ঘন যাতায়াতের সূত্র ধরে  এই সাংবাদিক জানান, ‘ আগে প্রতি বছর তিন থেকে সাতটি হত্যার ঘটনা ঘটত। কিন্তু জেলে,বাওয়ালিরা বলছে, বনে এখন ঘন ঘন গর্জন শুনতে পাওযা যায়। কোথাও কোথাও শাবকের দেখাও তারা পেয়েছ। আইনশৃংখলা বাহিনী ও বনবিভাগে টহল “স্মার্ট টিম” বেশ তৎপর। নিয়ন্ত্রণের রয়েছে চোরা শিকারিদের চলাফেরা। ভারতের ডাকাতরা এখন আর বনে প্রবেশ করতে পারেনা। আগের যে কোন সময়ের চেয়ে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এখন নিরাপদ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.