ডেস্ক:আজ ১৯ জুলাই। বাংলা কথা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা হুমায়ূন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হিমু ও মিসির আলীর স্রষ্টা।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয় পুরো বিশ্বের বাংলা ভাষীরা। বাংলাদেশের সাহিত্যানুরাগী ও হুমায়ূন পরিবার আজ গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে চিরনিদ্রায় শায়িত হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী আলোচনা ও গাম্ভীর্যের মাধ্যমে পালন করছেন।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যু বার্ষিকীতে সামাজিক মাধ্যম জুড়েও হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান ভারতীয় সাহিত্য থেকে যে ব্যক্তি বাংলাদেশের পাঠকদের মুক্ত করে বাংলাদেশের সাহিত্য প্রকাশনীকে জীবন্ত রেখেছেন তিনি হুমায়ূন। একাধারে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে একের পর এক জনপ্রিয় চরিত্র সৃষ্টি করে যিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। সে হোক জোছনা ও জননী, কুটু মিয়া, হিমু বা মিসির আলি কোনটি থেকে কোনটিকে সেরা বলবেন? যেকোন মানুষকে ‘মিসির আলী UnSolved’ এবং ‘মিসির আলীর অমীমাংসিত রহস্য’ বই দুইটি বিস্মিত করতে পারে।

ইন্টারনেটের যুগে বইবিমুখ আবালবৃদ্ধবণিতাকে যে ব্যক্তি বইপ্রিয় করেছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদ। সাহিত্যের প্রতিটি বাক্যে যিনি চমৎকার রসবোধ এর সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদ ।

বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পষ্ট নারী অধিকার কর্মী হুমায়ূন ।তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে বা গল্পে বা নাটকে নারীর সংগ্রামকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। ‘নী’ থেকে শুরু করে এবং হিমু বা বিপদ বা ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’ সবগুলোতে নারীকে অসামান্য গুরুত্ত্ব দিয়েছেন হুমায়ূন । হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’ অনবদ্য এক সৃষ্টি

মিসির আলীর মত এক প্রখর ও যৌক্তিক মেধাবী চরিত্রের যিনি স্রষ্টা সেই ব্যক্তিই হিমুর মত ভবঘুরে ও আধ্যাত্মিক চরিত্রের রূপায়নকারী। যুক্তি ও অযুক্তি, আবেগ ও বিশ্লেষণের সমারোহে প্রতিটি চরিত্রকে জীবন্ত করেছেন তিনি।

হুমায়ূনের লেখার সবচেয়ে বড় স্বকীয়তা গল্পের প্রথমেই আপনি শেষ বুঝে ফেলতে ব্যর্থ হবেন। এমন কি পরের লাইনটাও আপনি যা ভাবছেন তা লিখবেননা। হুমায়ূন আহমেদ লেখায় ও শব্দে নিপুণভাবে যৌনতা পাশ কাটিযে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছেন। যারা সাহিত্যে গালিগালাজ আনা আবশ্যক ভাবেন সেই সব সাহিত্যিককে নীরবে চপেটাঘাত করেন হুমায়ূন। সব বয়সী পাঠকেরা নির্দ্বিধায় তাকে পড়তে পারে।

হুমায়ূন আহমেদের ‘আমেরিকা’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণকাহিনী।

হুমায়ূন আহমেদ প্রথম বাংলা ভাষার সাহিত্যিক যিনি তৃতীয় লিঙ্গ তথা হিজড়াদের নিয়ে মিসির আলি সিরিজের একটি পূর্ণ উপন্যাস লিখেছেন এর নাম ‘নী’। এছাড়া কথিত জিনে ধরা মেয়েদের সাইকোলজি নিয়েও তিনি মিসির আলির একটি গল্প লেখেন।

চলচ্চিত্রে কাউন্টার ডিসকোর্সের সফল প্রয়োগ করেছেন। আগুনের পরশমনিতে দাঁড়িওয়ালা এক হুজুরকে দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলিয়েছেন তিনি। তার রাজাকারদের দাঁড়িটুপি ছাড়াও দেখা যায়। এই ডিসকোর্স খুবই জটিল, তবু তিনি চেষ্টা করেছেন একে প্রতিষ্ঠিত করতে। ঘেঁটুপুত্র কমলা হুমায়ূনের জীবনের সবচেয়ে দূর্বল কাহিনী সিলেকশান বলে মনে করি। দেড়শ বছর আগের এই কাহিনীর চেয়ে দেড়শ বছর আগের অনেক মার্জিত এবং হৃদয়স্পর্শী কাহিনী আছে যা হুমায়ূনের হাতে জীবন্ত হতো এবং শিক্ষণীয় বার্তা দিতে পারতো। তবে এটি পাঠক ও দর্শকের চাহিদার ভিত্তিতে বললাম। যতদূর জানি সিনেমাটি ফ্লপ ছিল।

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে বা নাটকে বা গল্পে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা এক স্বেচ্ছায় বাস্তুহারা প্রজন্মের সফল উপস্থাপন চোখে পড়ে। তারা গ্রামে যায় শহর থেকে। তারপর ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ ঘটে। গ্রামের মানুষের সারল্য বা কূটতাও থাকে। নায়কের নাম হয় রফিক বা বাকের আর নায়িকা রানু বা রুনা। রূপাদের আগমন বহু পরে, এই যুগে এসে ।

ছোটগল্পেও অসামান্য ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এক ‘অয়োময়’ হুমায়ূন আহমেদকে এ যুগের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার বানাতে যথেষ্ট। ঐ গ্রন্থে টিউশনি করা এক ছাত্রের প্রেম কাহিনী পড়ে যে কারো চোখ জলে ভিজে যেতে পারে।

হুমায়ূন আহমেদ কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর প্রথম কবিতা ছিল একটি সনেট। পরে অজ্ঞাত কারণে আর কবিতা লেখেননি। কবিতা ছাড়া সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে এক কদম পদচারণা নেই হুমায়ূনের। এমন কি মঞ্চনাটকও লিখে গেছেন। তার মহাপুরুষ নামের মঞ্চনাটক আপনার চিন্তার স্বাভাবিক জগৎকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং মহাপুরুষের নিয়মনীতির দ্বন্দ্বের ভয়ঙ্কর সফল উপস্থাপন ঐ নাটকটি।

হুমায়ূন সংগীত লিখেছেন,সুর দিয়েছেন এবং গাইয়েছেন। তিনি বহু লোকসুর ও গান সংগ্রহও করেছেন। এক যে ছিল সোনার কন্যা বা চাঁদনী পসর রাইতে বা আমার আছে জল হুমায়ূনের সংগীত প্রতিভার প্রকাশ। ঘেঁটুপুত্র কমলায় তিনি সংগৃহিত গান রেখেছেন। তার একটি দর্শক নন্দিত ‘আমার যমুনার জল দেখতে কালা’।

হুমায়ূন প্রকৃতি ও প্রাণের পূজারি ছিলেন। জীবনের প্রয়োজনে বৃক্ষকে তিনি ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতেন। তাঁর মতে,বৃক্ষ মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। জীবন নেয় ও দেয়। ‘অন্যভুবন’ নামের কল্পকাহিনীটি ঠিক এই বৃক্ষ বন্দনা দৃষ্টিভঙ্গীতে লেখা। এছাড়া অনেক লেখায় তার চরিত্ররা গাছের সাথে সম্পর্কিত।

‘দেয়াল’ হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব সৃষ্টি নয়। এ উপন্যাসটির কিছু অংশ উচ্চ আদালতের রায়ে ইতিহাস বিকৃতির দায়ে পরিবর্তন করতে বাধ্য হন হুমায়ূন আহমেদ। ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ এবং আরো কিছু পুস্তকের নির্যাস এই পুস্তকটি, এটি হুমায়ূনের নিজস্ব কোন ভাবনা নয় ।

বাংলা টিভি নাটকে হাস্যরসের এক অদ্বিতীয় ধারার সৃষ্টি করেছেন হুমায়ূন। হুমায়ূন আহমেদ অন্যতম শ্রেষ্ঠ টিভি নাটক নির্মাতা। বৃন্দাবন দাস, লাভলু, সাগর জাহান,অরণ্য আনোয়ার প্রায় একই ধাঁচের সফল নির্মাতা। তার নির্মিত টিভি নাটকের বাকের ভাই চরিত্রকে ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল হয়েছে যা অনন্য। হুমায়ূনের নাটক ‘তারা তিনজন’ আধামৃত মানুষকে হাসিয়ে দমফাটিয়ে পুরো মৃত বানিয়ে দিতে পারে।

লিখেছেন ‘অনন্ত নক্ষত্রবিথী’ ও ‘ফিহা সমীকরণের’ মত কিছু ভয়ঙ্কর সুন্দর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, বাংলা কল্প বিজ্ঞান সাহিত্যের অগ্রদূত হুমায়ূন আহমেদ। হতে পারে ছোট ভাই জাফর ইকবালের দিকে তাকিয়ে তিনি আর সায়েন্স ফিকশন লেখেননি। কারণ তিনি সাহিত্যের যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকজনের একজন ছিলেন যারা কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। এ কঠিন বিষয়ে তিনি সহজ করে একটি বই লিখেছেন। কসমিক অবজার্ভারের মাধ্যমে এক সাক্ষাত্‍কারে স্রষ্টার অস্তিত্ত্ব থাকার ব্যাপারে বলেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ কি লিখেছেন তা নিয়ে বাংলাদেশের কিছু মানুষ খুব সমালোচনা করে। তাদের কথা, কি সব গাছপালা, তেলাপোকা, স্বপ্ন, ভয় ইত্যাদি নিয়ে উপন্যাস লেখেন তিনি। অথচ এই লোকগুলোই পশ্চিমের সুররিয়াল সাহিত্য ও শিল্প নিয়ে নানা বাহুল্য করে। হুমায়ূন আহমেদ যে একজন সুররিয়াল সাহিত্যিক তা কবে এই বাংলার সাহিত্যিক ও সস্তা সমালোচকরা বুঝবেন কে জানে? ইন্টারনেট যখন মানুষকে বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে তখনো হুমায়ূনের সাহিত্য তরুণ থেকে বয়সী সকলকে সমান আকর্ষণে টানছে। বই মেলায় এখনো হুমায়ূনের উপন্যাসগুলো বেস্টসেলার হয়। যে অন্য জগতের দেখা হুমায়ূন আমাদের সাহিত্যেল মাধ্যমে দেখান সেটি সুররিয়াল, সেই রিয়ালিটিকে ধরতে হলে এই কাঠখোট্রা পৃথিবী থেকে একটু নীরবতাকে ভালবাসতে হবে। জ্যামে আটকে পড়া অবস্থায় যেসব ভাবনা আসে এই নগরে তার প্রকাশ যেন হুমায়ূন।

শেষ জীবনে এসে শাওনকে বিয়ে করে বিতর্কিত হয়েছেন, তবে নিজের ভাল লাগা ও ভালবাসাকে অস্বীকার করেননি হুমায়ূন আহমেদ। জীবনটা তাঁর সাফল্যমন্ডিতই ছিল। নিজে চলে গেছেন আর জেনেশুনে রেখে গেছেন অসংখ্য পাগলা ভক্ত, বিভিন্ন বয়সের এতটা পাঠক এ জগতে আর কোন লেখক রেখে গেছেন কি না সেটা আমি জানিনা।

তাইতো এখনো মন খারাপ হলে বসে পড়ি হিমুর সঙ্গে মধ্যদুপুরে, ধানমন্ডি থানার ইংরেজি সাহিত্যে পড়া ওসি, মাজেদা খালা, রানু-মৃন্ময়ী-রূপার দেখা পেয়ে হাসি অথবা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ি দেবী কিংবা বৃহন্নলাকে নিয়ে, কোন পরিচিত বা অপরিচিত রহস্যের শেষ দেখতেই…।

হুমায়ূন আহমেদ, আপনি চিরন্তন, আপনি মহাপুরুষ হৃদয়ের পাঠ্যসূচিতে…।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.