বিশেষ প্রতিনিধি : নির্যাতনের শিকার হয়ে কয়েক মাস ধরেই সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরছেন নারী শ্রমিকেরা। পাশবিক নির্যাতনের সেই সব বাস্তব উপাখ্যানে অশ্রু ঝরেছে প্রতিটি মানবিক হৃদয়ের। নানা সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও। নানা প্রতিবাদ আর সমালোচনার মুখেও থেমে নেই কর্মী হিসেবে সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো। এমনকি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে সৌদি যেতে চাওয়া নারীদের ভিড়। দলে দলে নারীরা আসছেন প্রশিক্ষণ নিতে, কেউ আসছেন সাক্ষাৎকার দিতে। উত্তীর্ণ হয়ে তাদের অনেকেই নতুন করে পাড়ি জমাচ্ছে সৌদি আরবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রবাসীকল্যাণ ভবনে আসা নারীদের কারও সঙ্গে থাকছেন পরিবারের সদস্য, কারও সঙ্গে গাইড হিসেবে থাকছেন নামমাত্র আত্মীয় অথবা রিক্রুটিং এজেন্সির কর্মী।

চাঁপাইনবাবনগঞ্জ থেকে গত ১২ জুলাই, বৃহস্পতিবার ‘এক বোনের’ সঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ভবনে এসেছিলেন মাউন জেরা (৩০)। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘পাসপোর্ট ও ট্রেনিং করেছি, মেডিকেলে টিকেছি। ফিঙ্গারও দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা।’ বোনকে এখনও কেনো সৌদি আরবে পাঠাচ্ছেন জানতে চাইলে সঙ্গে থাকা ওই নারী বলেন, ‘যারা গিয়েছিল তারা ঠিকভাবে যেতে পারেনি। তাদের কাগপত্র ঠিক ছিল না। নিজের বোনকে পাঠাচ্ছি তাই সব দেখে ঠিকভাবেই পাঠাচ্ছি।’

ছোট বোন আমিরুন নেসাকে (৩০) নিয়ে সাতক্ষীরা থেকে এসেছিলেন আনসার আলী। কাচন্দাগ্রামের ওই বাসিন্দা বলেন, ‘সৌদি যেতে ছোট বোনের এক টাকাও লাগছে না। এর আগেও সে দুই বছর জর্ডানে ছিল। দ্বিতীয়বার যাওয়ার জন্য সাক্ষাৎকার দিতে এসেছে। মেডিকেল থেকে শুরু করে কোনো কাজেই কোনো টাকা লাগেনি।’ পরে সোমবার (১৬ জুলাই) মুঠোফোনে কথা হলে আনসার আলী সারাবাংলাকে বলেন, সাক্ষাৎকারে তার বোন টিকে গেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সে সৌদি যাচ্ছে। তবে এখনও যাওয়ার তারিখ ঠিক হয়নি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে যাচ্ছে সেখানে আমাদের আত্মীয় আছে। তাই সমস্যা হবে না। এ ছাড়াও আগে সে বিদেশ করে এসেছে।’

এদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ভবনেই এসব কর্মীদের সঙ্গে দালাল কিংবা রিক্রুটিং এজেন্সির লোককে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতেও দেখা গেছে।

গত ১২ জুলাই, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে প্রবাসীকল্যাণ ভবনের সাত তলা থেকে সাক্ষাৎকার দিয়ে নামছিলেন সিলেট থেকে আসা নারী কর্মীদের একটি দল। হবিগঞ্জ থেকে আসা স্বপ্না, শরিফা ও পাখিদের এই দলটিকে উদ্দেশ্য করে সঙ্গে থাকা এক পুরুষ (রিক্রুট এজেন্সির কর্মী) হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘এটা সিলেট নয়, ঢাকা।’ প্রবাসে যেতে ইচ্ছুক এসব কর্মীদের সঙ্গে ওই ব্যক্তির আচরণেই অনুমেয়, প্রতিজ্ঞা দেওয়া কোনো ঘটনায় হয়তো হেরফের ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গেই ওই ব্যক্তি আবারও প্রবাসীকল্যাণ ভবনের উপরের দিকে উঠে যাওয়ায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

পরে, এই প্রতিবেদক অনুসরণ করে স্বপ্না ও শরিফাদের দলটিকে। যাদের সবার কাঙ্খিত গন্তব্য সৌদি আরব। ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বপ্না ও শরিফাদের কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। একাধিকবার চেষ্টার পর স্বপ্না (২৪) জানান, ‘তারা সবাই এসেছিলেন সাক্ষাৎকার দিতে। তাদেরকে নানা ধারণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। থালাবাটি পরিষ্কার থেকে শুরু করে ভাষা রপ্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে।’ সৌদি আরবের ঘটনা জানেন কি-না জানতে চাইলে স্বপ্না বলেন, ‘আগে যারা গিয়েছিল তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে যায়নি। আমাদেরকে ভাষা শেখানো হয়েছে। কীভাবে কথা বলতে হবে, কখন কি করতে হবে; সব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ স্বপ্নার সঙ্গে থাকা ওই দলের নারী সদস্যরাও প্রায় একই কথা বলেন।

এ সময় ঘটনাস্থালে উপস্থিত সদ্য সৌদি ফেরত নারায়নগঞ্জের জয়নাল বলেন, ‘এরা মনে হয় সৌদি যাবে। আহারে, সৌদির অবস্থা ভালো না!’ বলে বেশ কিছুক্ষণ আক্ষেপ করতে থাকেন ১৯ বছর সে দেশে থেকে আসা এই কর্মী।

এদিকে, গত কয়েক মাস ধরেই নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি থেকে নারী শ্রমিকেরা দেশে ফিরছেন। বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ মে, জুন ও জুলাইয়ের ১০ তারিখ পর্যন্ত অন্তত ১২০০ নির্যাতিত নারী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন বলে বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। ধারাবাহিকভাবে নির্যাতিত নারী শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে থাকলে চারদিকে ‘মুখে মুখে’ প্রতিবাদের ঝড় উঠে। একই সঙ্গে সৌদিতে গৃহকর্মী উপর নির্যাতনের প্রতিবাদে বিভিন্ন সংগঠন সভা-সমাবেশ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সরকারিভাবে সৌদিতে নারী শ্রমিক না পাঠানো পক্ষেও নাগরিক সমাজের আওয়াজ জোরালে রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও নারী শ্রমিক পাঠানোর পক্ষেই সরকার।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে বিনা টাকায় নারী শ্রমিক পাঠানো অব্যাহত রয়েছে। তবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) প্রশিক্ষণে আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ও আরবি ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যোগাযোগোর ক্ষেত্রেও থাকতে হবে আধুনিক দক্ষতা। বয়স ২৫ থেকে ৪০ এবং দক্ষকর্মী হতে হবে। বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রশিক্ষণে ব্যাপক পরিবতর্ন এনেছি। আরেকটু দক্ষ করে নারী শ্রমিক পাঠানোর চেষ্টা করছি। সৌদিতে যা ঘটেছে তা খুবই কম, তারপরও আমরা মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছি।’

প্রশ্ন উঠার পরও এখনও কেন নারী শ্রকিদের সৌদি পাঠানো হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, ‘প্রতিদিন এক কথা বলতে ভালো লাগে না।’ একই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান বলেন, ‘এরা বাধ্য হয়ে পেটের তাগিদে বিদেশ যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সব জেনেই। আবার সব তথ্য এদের কানেও পৌঁছায় না। এদিকে যারা যাচ্ছে তারাই নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত যাদের পাঠানো হচ্ছে তাদেরকে আরও দক্ষ করে পাঠানো। বিশেষত ভাষা এবং যে কাজে পাঠানো হচ্ছে কেবল সেই কাজে দক্ষ কর্মী।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.