ফ্রান্স ৪ : ক্রোয়েশিয়া ২

ডেস্ক : আপনি যতোই ভালো খেলেন না কেন, ম্যাচে জেতে কিন্তু বেশি গোল করা দলই!

গোলের খেলা ফুটবলের সেই চিরায়িত শ্লোগান নিয়েই বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে উল্লাসে মাতল ফ্রান্স। আর ভাল খেলেও কোন লাভ নেই-যদি না গোল করতে পারো; ক্রোয়েশিয়ার জন্য সেই দুঃখই হয়েই রইল রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনাল।

৪-২ গোলের স্কোরলাইন হয়তো এই ফাইনালের প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাষ তেমন দিচ্ছে না। তবে ম্যাচের প্রথমার্ধে ২-১ গোলে পিছিয়ে থেকেও ক্রোয়েশিয়া যে দাপুটে এবং প্রভাবী ফুটবল খেললো তাতে তারা আরেকবার হৃদয় ঠিকই জিতল; কিন্তু ম্যাচের শেষ বাঁশি যখন বাজল তখন উল্লাস যে শুধু করল ফ্রান্স।

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উল্লাস। বিশ্বকাপে এটি ফ্রান্সের দ্বিতীয় শিরোপা।

৯০ মিনিটের ফাইনালকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও ক্রোয়েশিয়া সুন্দর ফুটবলের হকদার। আর দ্বিতীয়ার্ধে গোলের উৎসব করে ফ্রান্স আগামী চারবছরের জন্য বিশ্বকাপের দাবিদার! ২-১ গোলে এগিয়ে থাকা ফ্রান্স দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর খানিকবাদেই স্কোরলাইন ৪-১ করে দেয়। মুলত এই ফাইনালের ফল তখনই পরিস্কার হয়ে যায়। সঞ্চয়ে বেশি গোল জমা হয়ে গেলে যা হয়-খানিকটা আত্মতুষ্ঠি বা আত্মতৃপ্তি চলে আসে; সেই সমস্যা বাঁধিয়ে ফ্রান্সের গোলরক্ষক হুগো লরিস যে গোল হজম করলেন সেটা তাকে অনেকদিন পোড়াবে। ব্যাকপাস থেকে আসা বল ক্লিয়ার না করে লরিস সামনে থাকা মানজুকিচের সঙ্গে ড্রিবলিংয়ের কারিকুরি শুরু করে দেন।

/uploads/files/xcKE12SZaeIyocoYnmHB8mPnZ0co7BT1NpGoiLbT.jpeg

স্ট্রাইকারের সঙ্গে এমন ‘মাস্তানির’ শাস্তি হিসেবে লরিস দেখেন বল জালে! তবে এই বোকামো মার্কা গোল হজমের পর ফ্রান্সের রক্ষণ সতর্কতার মাত্রা সর্বোচ্চ করে দেয়। ক্রোয়েশিয়া চেষ্টার পর চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি যে ততক্ষণে ফ্রান্সের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। তাই বাড়তি গোলের পথে না ছুটে লিড অক্ষত রাখার চেষ্টাই করে তারা। এবং দারুণভাবে তাতে সফলও হয় তারা।

৫৯ মিনিটে পল পগবা এবং ৬৫ মিনিটে কিলিয়েন এমবাপ্পের দুই গোলার মতো শটেই এই ফাইনালের হিসেব পরিস্কার করে দেয় ফ্রান্স। দুজনেই প্রায় সমান দুরুত্ব থেকে একই কায়দায় ক্রোয়েশিয়ার জালে বল পাঠান। দুটো শটেই এত জোর ছিল এবং এত দ্রুতগতি নিয়েছিল যে গোলপোষ্টে দাড়ানো সুভাসিচ জায়গা ছেড়ে নড়ার সুযোগই পাননি! নড়তে গিয়েই দেখেন বল জালে। আর ফ্রান্সের ডাগআউটে তখনি যে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ শুরু।

ফাইনালে হট ফেবারিট ছিল ফ্রান্স। অথচ কি দুর্দান্ত দাপুটে ভঙ্গিতেই না ম্যাচ শুরু করল ক্রোয়েশিয়া। প্রেসিং ফুটবলের ধাক্কায় ফ্রান্সের ফেবারিট তকমা প্রায় উড়ে যাওয়ার অবস্থায় পড়ে। ঠিক তখনই পুরো ম্যাচের ¯স্রোতের বিপরীতে গোল পেয়ে যায় ফ্রান্স। তাও আবার আত্মঘাতি গোলে! গ্রিজম্যানের ফ্রিফিক থেকে উড়ে আসা বল ক্লিয়ার করতে পেনাল্টি বক্সে লাফিয়ে উঠে হেড করেন মানজুকিচ। বল তার মাথার উপরিভাগে হালকা স্পর্শ নিয়ে জালে! ফ্রান্সের লিড।

/uploads/files/R1x7ihTjqmhiMpDxjv6yFEjFggdHEm76Rk4sbFix.jpeg

তবে পিছিয়ে পড়েও বীরত্বের ভঙ্গিতে লড়াই করে ক্রোয়েশিয়া। বারবার আক্রমণে কাঁপিয়ে দেয় ফ্রান্সের রক্ষণ। যেভাবে খেলছিল ক্রোয়েশিয়া তাতে গোল পাওয়াটা ছিল তাদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। এবং সেটা তারা পেয়েও গেল। মানজুকিচের ফ্রিকিক থেকে পাওয়া বল ভিদা ডি বক্সের ভেতরে সামনে দাড়ানো ইভান পেরিসিচের দিকে বাড়িয়ে দেন। ডানপায়ের স্পর্শে বলকে শটের পজিশনে নিয়ে বামপা থেকে প্রচন্ড শট নেন পেরিসিচ। বামদিকে ঝাঁপিয়ে সেই গোল রক্ষা করতে পারেননি লরিস.. গোল এবং ম্যাচে ১-১ সমতা। এই গোলের পর ক্রোয়েশিয়া যেন আরও জেগে উঠে।

মনে হচ্ছিল এই ম্যাচেই তারাই একমাত্র দল যারা বিশ্বকাপ জিততে মাঠে নেমেছে। প্রতিজ্ঞা, জেদ, বল নিয়ন্ত্রণের কৌশল, আক্রমণে উঠে আসা, বল দখলে প্রভাব-সব ফ্যাক্টরে ক্রোয়েশিয়া চাপে রাখে ফ্রান্সকে। ঠিক তখনই আরেকবার বিপদ ঘাড়ে। ডি বক্সে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে পেরিসিচের হাতে লাগে বল। আর্জেন্টাইন রেফারি ভিডিও রিপ্লে দেখে পেনাল্টির নির্দেশ দিলেন। পেরিসিচের এই হ্যান্ডবল ইচ্ছেকৃত ছিল না অনিচ্ছাকৃত সেটা নিয়ে আগামী অনেকদিন হয়তো আলোচনা-সমালোচনা হবে। তবে পেনাল্টি থেকে গ্রিজম্যানের গোলে সেই যে ফাইনালে এগিয়ে গেল ফ্রান্স, সেটাই তাদের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ এনে দিল।

/uploads/files/6kllv4ptIEH3Cs7gikzy6alaN3Lpiui8rzYu66qG.jpeg

কারণ আর কিছু নয়, গ্রিজম্যান যে ম্যাচে গোল করেন সেই ম্যাচে ফ্রান্স কখনোই হারেনি। রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালেও সেই রেকর্ডই অক্ষুণœ রইল!

এরপর দ্বিতীয়ার্ধের কাহিনীর প্রায় পুরোটা জুড়েই ফ্রান্সের গোল উৎসবের গল্প। প্রথমে পল পগবা, খানিকবাদে এমবাপ্পে- এই দুই তারকার দুই গোলেই ফ্রান্স লিড নেয় ৪-১ গোলের! যে অবস্থান থেকে বিশ্বকাপের ফাইনালে কখনো কোন দল হারেনি।

মস্কোর লুজনিকি ষ্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ফ্রান্স উল্লাস করছে। চারপাশে রং বেরংয়ের কনফেত্তি উড়ছে। সেই আলোয় ফ্রান্সের পাগল পারা উল্লাস। আর এত রঙিন উৎসবেও ক্রোয়েশিয়ার জন্য ফাইনালের রাতটা নেহাৎ সেই সাদা কালো হয়েই রইল।

ফ্রান্সকে অভিনন্দন বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার আনন্দে। ক্রোয়েশিয়াকে ধন্যবাদ হৃদয় জেতার জন্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.