ডেস্ক : ‘নেভার সে ডাই-’ জেমস বন্ড সিরিজের বিখ্যাত সিনেমা। খেলার মাঝবিরতিতে বিশ্রামের জন্য সময় থাকে মাত্র পনের মিনিট। অল্প সময়ে এত লম্বা এই সিনেমা দেখা সম্ভব নয়! তবে সেই অল্পসময়ের মধ্যে জার্মান কোচ জোয়াকিম লো তার পুরো দলকে যা বললেন, যে কথায় উদ্বীপ্ত-উজ্জীবিত করলেন তাতেই পরের অর্ধে বদলে গেল পুরো দল। ঝাঁপিয়ে নামল ফুটবল মাঠের এক যুদ্ধ জয়ে।

-বিরতিতে দলকে কি বলেছিলেন জার্মান কোচ? সেটা আগে শুনি কোচের কাছ থেকেই।

“ধৈর্য্য ধরে রাখ। আমরা পিছিয়ে আছি। তবে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু লং পাসে বাতাসে বল ভাসালেই হবে না। পাসের পর পাস খেলতে হবে। সেটা অবশ্যই তড়িৎগতিতে। আক্রমণের ব্যাপকতা বাড়াতে হবে। আরও বড় জায়গা জুড়ে আক্রমণে যাও। ম্যাচের মোড় ঘোরাতে এখনো আমাদের হাতে ৪৫ মিনিট আছে। যাও এবং ম্যাচটা জিতে ফিরে এসো।”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাত-পা নাড়িয়ে দলকে তেঁতিয়ে তুলছেন কোচ। গলার রগ ফুলে উঠছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ। ঝাঁকড়াচুলো কোচের ভাবভঙ্গির প্রতিটি নড়াচড়ায় যুদ্ধজয়ের প্রবল আকাঙ্খা ডানা ঝাপটাচ্ছে। সামনে দাঁড়ানো পুরো দল যেন যুদ্ধক্ষেত্রের সামনের সাারিতে দাড়ানো অকুতোভয় সৈনিক। কোচের প্রতিটি কথার শব্দ তাদের মস্তিস্কের নিউরোনে স্ফুলিঙ্গ ছড়াচ্ছে। শক্ত চোয়ালে নীরব প্রতিজ্ঞা-লড়তে হবে, পিছিয়ে পড়া যুদ্ধে জিততেই হবে!

লড়াইয়ের এই মনোভাবই বদলে দিল দ্বিতীয়ার্ধের জার্মানিকে। এই অর্ধের খেলা শুরুর তিন মিনিটের মধ্যে মার্কো রয়েসের গোলে ম্যাচে সমতা। আর আত্মবিশ্বাসী এই গোলের পরই জার্মানির বিশ্বাস আরও তুঙ্গে-আমরাই জিতবো এই ম্যাচে।

পরের সময়জুড়ে ঠিক যাকে বলে আক্রমণ প্রলয় সেটাই চালিয়ে গেল জার্মানি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে উপরে উঠে। কখনো ডানদিনের কখনো বামদিকের ফ্ল্যাঙ্ক থেকে আক্রমণ। সুইডিশ ডি বক্সের দু’পাশ থেকে ভেতরে ক্রস। সেখান থেকে শট। সেই শট কখনো সুইডিশ ডিফেন্ডারের গায়ে লাগে। কখনো ব্লক হয়। কখনো ডিফ্লেক্ট হয়ে কর্নার। গোল হতে হতেও হচ্ছিল না! তবে পুরো সময়ের জন্য কখনোই জার্মানির কাউকে হতাশ থেকে দেখা যায়নি। একটা আক্রমণ সফল হয়নি দেখে তারা থেমে পড়েনি। বরং পরের মিনিটেই নতুন শক্তি নিয়ে ফের ঝাঁপায়। ফের সেই একই আক্রমণের প্যাটার্ন-ওয়াইড পাস হয়ে ডিবক্সের বাইরে বা ভেতরে গিয়ে পড়ে ক্রস। সেই ক্রস প্রতিহত হয়। কখনো ক্রসপিচে লেগে ফিরে। কোনটা আবার সুইডিশ গোলকিপার অলসেনের দক্ষতায় রক্ষা। তবে থমকে না যাওয়ার অদম্য মনোভাব, সেই সঙ্গে আক্রমণে সৃজনশীলতা, নিজ শক্তিতে আস্থা, চেষ্টা এবং চেষ্টা-এই সম্মিলিত শক্তিতে ফুটবল মাঠের অবিস্মরনীয় একটা ‘যুদ্ধ’ জিতল জার্মানি।

এই ম্যাচের আগে জার্মানিকে অনেক ফুটবল পন্ডিত গোনার বাইরে ফেলে দিয়েছিলেন। মেক্সিকোর কাছে প্রথম ম্যাচে হারে জার্মানির বিশ্বকাপের ট্র্যাক থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কায়। সুইডেনের কাছে প্রথমার্ধের গোলে পিছিয়ে পড়ার পর সেই শঙ্কা অনেকের কাছে আতঙ্কে পরিণত। তবে জার্মানি জানে পিছিয়ে পড়া যুদ্ধ কিভাবে জিততে হয়? ৮০ মিনিটের সময় জেরম বোয়াটেং এর লালকার্ডে জার্মানি ম্যাচে দশজনের দল। অন্য কেউ হলে ম্যাচে তখন ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টায় রক্ষণভাগের দিকে বেশি মনোযোগী হত। কিন্তু জার্মানি জানে- যুদ্ধজয়ের জন্য সৈনিকের সংখ্যার চেয়ে মনোভাবটাই বেশি আসল।

বেশি কার্যকর। বেশি প্রয়োজনীয়। সেই বিশ্বাস নিয়েই জোয়াকিম লো বলছেন-‘এই ম্যাচে কখনোই আমরা আস্থা হারাইনি। বিশ্বাস ছিল ঠিকই ঘুরে দাড়াতে পারবো। মানছি জয়সুচক গোলে কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা ছিল। তবে এই জয়, এই গোল যা জানাচ্ছে তার নাম-নিজ শক্তিতে আস্থা, বিশ্বাস!

ম্যাচের ৯৫ মিনিটে টনি ক্রুসের ফ্রিকিকের গোল জার্মানিকে শুধু এই ম্যাচই জেতাল তা নয়, বিশ্বকাপের হট ফেভারিটের মর্যাদাটাও ফিরিয়ে দিচ্ছে! অথচ ‘এফ’ গ্রুপে এখনো টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় রাউন্ডের জন্য কোন দলই নিশ্চিত নয়। মেক্সিকোর কাছে হারের পর প্রথম রাউন্ড থেকেই বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের সম্ভাব্য বিদায় নিয়ে অনেকেই শোকবার্তার শ্লোক লিখতে শুরু করেছিলেন। সেই জার্মানিই এখন আবার বাজির বাজারে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন দলের মুল্য তালিকার শীর্ষে!

একটা ম্যাচ। একটা গোল। অনেকখানি জেদ জার্মানিকে প্রায় শূণ্য থেকে শীর্ষে তুলে এনেছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.