পিয়াল ঘোষ : ছোট্ট মেয়েটি প্রায়ই স্কুলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। কারণ সারা রাত তাকে জাগিয়ে রেখে তার কাকা তাকে ‘আদর’ করত। মেয়েটি বুঝতেও পারেনি প্রতিদিন সে হয়ে উঠছে যৌনপীড়নের শিকার। এই ঘটনাটি আমাদের চেনা। আমরা রুপোলি পর্দায় এই ঘটনাটির উপর একটি ছায়াছবি দেখেছি।

আমাদের আশপাশে প্রতিনিয়ত এই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা এতটাই হিংসাত্মক আকার ধারণ করে যে কিছু না বুঝেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয় ফুলের মতো শিশুদের।

রোজ সকালে একটা ভয়মিশ্রিত মন নিয়ে খবরের কাগজ খুলি। আজ আবার কোন সরল শৈশবের যৌনপীড়নের দুঃসংবাদ অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য।

যে ভাবে আমাদের দেশে প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার জন্য শুধু স্কুল ও প্রশাসনের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার দিন শেষ। আমাদের অভিভাবকদের প্রাত্যাহিক জীবনেও অনেক বিষয়ে আলোকপাত করতে হবে যা হয়ত ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের এর থেকে পরিত্রাণ দেবে।

বাচ্চা যখনই প্লে-স্কুলে যেতে শুরু করবে বা আশপাশের লোকজনের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করবে, ধীরে ধীরে তাকে শেখান সুইম স্যুট রুল। এই সুইম স্যুট রুল টা আসলে কী? আমাদের সুইমিং কস্টিউমে একটি ছেলে বা মেয়ের শরীরের যে যে অংশগুলো আবৃত থাকে, সেগুলোকে বলা হয় প্রাইভেট পার্টস। ছবি দেখিয়ে পরিষ্কার করে তা ওদের বুঝিয়ে দিন। তার সঙ্গে এটাও বলে দিন, কারও প্রাইভেট পার্টসে যেমন অযথা হাত দেওয়া উচিৎ নয় সে রকম জোর করে কেউ ওকে প্রাইভেট পার্টস দেখাতে বললে তা যেন সে কক্ষনো না দেখায়। বরং মা বা বাবাকে সে বিষয়ে অবশ্যই জানায়।

বাড়িতে অনেক সময় আমরা বড়রা বাচ্চাদের সামনে টেলিভিশনে এমন অনেক অনুষ্ঠান দেখি যাতে অনেকরকম ভায়োলেন্স বা ভয়াবহ দৃশ্য থাকে (ক্রাইম প্যাট্রল তার মধ্যে একটি)। আমরা বুঝতেও পারি না আমাদের সন্তানদের সরল ও নরম মনের ওপর কী পরিমাণ চাপ তৈরী হচ্ছে সে সব দেখে। তাই চেষ্টা করুন সব সময় বাড়িতে একটা টিভি রুটিন মেনে চলতে।

sexual_body_042118022112.jpgসুন্দর শৈশব

বাচ্চাদের সামনে সবসময় চেষ্টা করুন দাম্পত্যের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা রাখার। একটি ছোট ছেলে যদি সব সময়ই দেখে তার বাবা ক্রমাগত তার মা’কে আদেশের সুরে কথা বলছে, বিভিন্ন ভাবে তাকে হেনস্থা করছে অথবা তার মতামতের কোনও গুরুত্বই দিচ্ছে না, তখন থেকে তার মধ্যে ধারণা হতেই পারে, মেয়েদের সঙ্গে এ রকম ব্যবহারই হয়ত করতে হয়।

স্মার্টফোনে বাচ্চা কী দেখছে সে দিকে সব সময় নজর রাকুন। হয়ত আপনারই হোয়াটসঅ্যাপে থাকা কোনও অ্যাডাল্ট ভিডিও দেখছে!

আমাদের দেশের বেশির ভাগ ছবিতেই নায়িকাদের ‘আইটেম’ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত আমরা। বাচ্চাদের সামনে এ ধরণের ছবি নাই বা দেখলেন!

বাচ্চার সঙ্গে কথা বলুন সহজ ভাবে, এমন ভাবে কথা বলুন যাতে ওর কোনও কিছু বুঝতে সমস্যা না হয়। অনেক সময় বাচ্চারা কিছু না বুঝেই নানা রকম অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে পারে। সে ব্যাপারে নিজেরা ঢাক ঢাক গুড় গুড় না করে সহজ ভাবে প্রশ্নের উত্তর দিন।

এ প্রসঙ্গে একটি কেস স্টাডির কথা বলি।

তিন বছরের জিয়া (নাম পরিবর্তিত) বাড়ির সকলের সঙ্গে বসে টিভিতে কোনও একটা অনুষ্ঠান দেখছিল। হঠাৎ কমার্শিয়াল ব্রেকে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করল। কৌতুহলী তিতির ঘর ভর্তি লোকের সামনে তার মাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করল সেই বিষয়ে জানতে চেয়ে। তার মা এতে একটু অস্বস্তিতে পড়লেও তার বাবা তাকে বললেন ‘ছোটোবেলায় তুমি যে রকম ডায়পার পরতে, মেয়েদের বড় হলেও মাঝে মাঝে এরকম পরতে হয়, এটা বড় মেয়েদের ডায়পার, মাকেও মাঝে মাঝে পরতে হয়’।

স্বচ্ছ সুন্দর উত্তর পেয়ে তিতিরও শান্ত হল।

বাচ্চাদের সঙ্গে যত সহজ হবেন, বাচ্চাও তত সহজ ভাবে ওর সব সমস্যার কথা আপনাকে বলতে পারবে।

বেডটাইমে বাচ্চাকে বিভিন্ন মরাল স্টোরিজ পড়ে শোনান। এতে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চার মধ্যে মূল্যবোধ এবং প্রকৃত শিক্ষা সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারনা তৈরি হবে।

বাচ্চাকে নিরাপদ ভাবে বড় করার জন্য খুব প্রয়োজন বাচ্চা আর মা-বাবার সান্নিধ্য ও যোগসূত্র বা বন্ডিং। আর তার সঙ্গে প্রয়োজন সঠিক পেরেন্টিং বা অভিভাবকত্ব করার মতো দূরদৃষ্টি। তাহলেই অনেক সমস্যার সহজ সমাধান করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.