ডেস্ক : আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। নতুন বছরের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর রয়েছে আত্মার যোগ। আজ তাই গ্রামবাংলার মানুষ আরো ভোরে ঘুম থেকে উঠবে, নতুন জামাকাপড় পরে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যাবে। বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করবে। করবে সাধ্যমতো বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও।
অনেক গ্রামে বসবে বৈশাখী মেলা। কোথাও আবার হবে গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির আয়োজন। এভাবে নানা উৎসব-আয়োজনের মধ্য দিয়ে গোটা বাংলাদেশ আজ আবাহন জানাবে নতুন বছরকে।

দিনটি উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দেয়েছেনপ্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি। এছাড়া আজ সরকারি ছুটির দিন।

বাংলা নববর্ষ ১৪২৫ উপলক্ষে দেশবাসী ও প্রবাসী বাঙালিসহ সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নতুন বছরের প্রথম দিনে আমরা অতীতের ব্যত্যয় এবং গ্লানি ভুলে জীবনের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে আশায় বুক বাঁধি। দেনাপাওনা চুকিয়ে নতুন করে শুরু হয় জীবনের জয়গান। পহেলা বৈশাখ তাই যুগ যুগ ধরে বাঙালির মননে মানসে শুধু বিনোদনের উৎস নয়, বৈষয়িক বিষয়েরও আধার।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পণ্যের ক্রয়বিক্রয়, হালখাতা উৎসব, নতুন পোশাক এবং মিষ্টান্নসহ হরেক রকমের খাবারের জমজমাট ব্যবসা, সব মিলিয়ে বাংলা নববর্ষ বিনোদনের পাশাপাশি আজ দেশের অর্থনীতিতে নতুনত্ব এনেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঙালির এই শাশ্বত সার্বজনীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য বাংলা নববর্ষ উৎসব ভাতা প্রবর্তন করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ এবং বাঙালির জাতীয়তাবাদ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বাঙালি জাতি বর্ষবরণ উৎসবকে ধারণ করেছে তাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে।

এদিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেন, অতীতের সব গ্লানি ও বিভেদ ভুলে বাংলা নববর্ষ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদের ঐক্যকে আরো সুসংহত করবে। সকল অশুভ ও অসুন্দরের ওপর সত্য ও সুন্দরের জয় হোক। বাংলা নববর্ষ সকলের জন্য আনন্দের বারতা বয়ে আনুক এ প্রত্যাশা করি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আবহমানকাল থেকে বাংলা নববর্ষ বাঙালি ঐতিহ্যে লালিত সর্বজনীন উৎসব। দিনটি সবাইকে প্রবলভাবে আপ্লুত করে এবং পুরাতনকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগায়। দেশজুড়ে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখি মেলা উদ্যাপন দেশীয় সংস্কৃতির প্রসারেও অনবদ্য ভূমিকা রাখে।

প্রবাসী বাঙালিরাও বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় নববর্ষ পালন করেন, যা এই উৎসবের আন্তর্জাতিকতাকে তুলে ধরে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষি, ব্যাবসা, পার্বণসহ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষের আবেদন তাই চিরন্তন ও সর্বজনীন।

পহেলা বৈশাখ রাত ১২ টা থেকে শুরু, নাকি সূর্যোদয় থেকে – এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষিফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হতো। খাজনা আদায়ে শৃঙ্খলা আনতে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন ও আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

সম্রাট আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখন এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা (নতুন হিসাব বই) তৈরি করা, যার মাধ্যমে বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব হালনাগাদ করা হতো। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। হালখাতা প্রথাটি এখনও অনেক স্থানে প্রচলিত আছে।

বাংলাদেশে এখন নানা উৎসবের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষকে আবাহন করা হয়। ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়।

এছাড়া রাজধানীতে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের পর পর ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান।

এর বাইরে প্রতি বছর ১২ বৈশাখ চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে জব্বারের বলিখেলা, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে বউমেলা ও ঘোড়ামেলাসহ বাংলার আনাচেকানাচে বসে সংখ্যাহীন লোকজ মেলা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে, যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি উৎসব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.