ডেস্ক : ইট, বালি, বিটুমিন কিংবা খোয়া – উন্নয়নকাজে ব্যবহার হয় এসব পণ্য। কিন্তু রাস্তা কিংবা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কি সঠিকভাবে এসব পণ্য ব্যবহার হয়? যে মানের পণ্য দিয়ে রাস্তা মেরামত করার কথা, তা কি আসলেই দেয়া হয়?

এমন হাজারো প্রশ্নের মধ্যেই সংস্কার কাজের দুর্নীতির উৎস অনুসন্ধান করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি মনে করে, পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নেই, তদারকি ব্যবস্থাও দুর্বল।

উন্নয়ন কাজের নানা দিক নিয়ে পাঁচ পাতার প্রতিবেদন তৈরি করেছে দুদক। “সড়ক ও জনপথ অধিদফতর সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানিক টিম’’ অনুসন্ধান করে একটি সুপারিশ প্রস্তুত করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কাছে পাঠিয়েছে দুদক। ওই প্রতিবেদনে পণ্যের মান এবং ব্যক্তির কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

খোয়া : সড়ক নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে খোয়া, যা পাথর বা ইট থেকে তৈরীকরা হয়। উন্নত মানের খোয়া ছাড়া সড়ক নির্মাণ করা হলে এর স্থায়িত্ব থাকে না। উন্নত মানের খোয়া তৈরির জন্য প্রয়োজন পাথর, পিকেট অথবা ১নং গ্রেডের ইট। শক্তির উপর ভিত্তি করে ইটকে চারটি ভাগ ভাগ করা হয়। প্রথমটি পিকেট, এছাড়া গ্রেড-১ ও ২ এবং গ্রেড তিন।

বলা হয়, খোয়া তৈরীর ক্ষেত্রে ইটের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করা হলেও প্রভাবশালী ঠিকাদারের চাপে অথবা প্রভাবশালীদের অবহেলায় কিংবা পরস্পরের যোগসাজসে অর্থ আত্নসাতের লক্ষ্যে গ্রেড-১ ইটের স্থলে নিম্নমানের ইট দিয়ে খোয়া তৈরি করে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। দুদক মনে করে, সড়ক নির্মাণে দুর্নীতি বন্ধ করা প্রয়োজন। ব্যবহৃত ইট বা খোয়ার মান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের প্রকৌশলীর মাধ্যমে প্রত্যয়ন করতে হবে।

বালি : সড়ক নির্মাণে টেন্ডারের শর্তানুসারে উন্নত বালি ব্যবহার না করে নিম্নমানের বালি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম তদারকির জন্য বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নির্মাণকাজে বিশেষজ্ঞ, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরে সুখ্যাতি আছে এমন প্রকৌশলীদের নিয়ে একাধিক মনিটরিং টিম গঠন করার পরামর্শ দিয়েছে দুদক। এসব কমিটি কেবল নির্মাণকাজে গুণগত মান ও পরিমাপের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী বা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট প্রদান করবেন। মনিটরিং কমিটির চুড়ান্ত রিপোর্ট ছাড়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চুড়ান্ত বিল দেবার বিষয়টি বিবেচনা করতে সুপরিশ করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের চাপ থেকে প্রকৌশলীদের সুরক্ষা দেবার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বিটুমিন : সড়ক নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিটুমিন। সরকারি বিটুমিন আমদানির দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইষ্টার্ন রিফাইনারি। প্রাথমিকভাবে বিটুমিনের গুনগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্পেসিফিকেশন অনুসারে যে পরিমাণ বিটুমিন ব্যবহার করার কথা তার চেয়ে কম বিটুমিন ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ বা মেরামতে ক্রমাগতভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মহাসড়কে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। তারপরও নির্মাণ কাজে ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশেষ কারিগরি প্রয়োজন ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পে বিটুমিনাস কাজে ৬০-৭০ গ্রেড মানের বিটুমিন ব্যবহারের যে নির্দেশনা তা পরিপালন নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে দুদক। বলা হয়, সংশ্লিষ্ট মাঠ প্রকৌশলীরা ঠিকাদার কর্তৃক ব্যবহারের জন্য নির্মাণ সাইটে মজুদকৃত বিটুমিন পরীক্ষা করে এ মান নিশ্চিত করবেন। এক্ষেত্রে গ্রেড মানের তারতম্য হলে ঠিকাদার, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও সরকারি অর্থ আত্নসাতের অভিযোগে দুদক আইনে মামলা করা যেতে পারে।

ইট : সড়ক নির্মাণে গ্রেড-১ ইট নির্মাণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিম্নমানের গ্রেড-২ এবং গ্রেড-৩ মানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে করে দুদক। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত ইটের এগ্রিগেড ক্রাশিং ভ্যালু (এসিভি) সংরক্ষণ করার সুপারিশ করা হয়।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দেশের অধিকাংশ নির্মাণকারী সংস্থায় জেলা পর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীরা পিপিআই অনুসারে সকল দরপত্র আহবান ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে থাকেন। কিন্তু সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী অথবা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের মাধ্যমে উচ্চ দরের বা বড় মাপের টেন্ডার আহবান করা হয়। সাধারণত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী অথবা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদমর্যাদার পদগুলোতে কর্মরত ব্যক্তিরা সুপারভাইজিং ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত। এ জাতীয় পদের কর্মকর্তাদের উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের সরাসরি দায়িত্ব না রেখে সুপারভাইজিং ও মনিটরিংয়ের পরামর্শ দিয়েছে দুদক। এতে নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাজ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

সড়ক নির্মাণ কাজ শুরুর আগে রাস্তায় কিছু মাটির কাজ করতে হয়। কাজ চলাকালীন সড়কের পাশে মাটি ফেলতে হয়। এই মাটির কাজ অনিয়ম-দুর্নীতির আরেক উৎস বলে মনে করে দুদক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাটির কাজের প্রাক্কলন করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান মাটিকে কম দেখিয়ে পরবর্তীতে মাটি ভর্তি দেখিয়ে ভুয়া বিল করা হয়। নির্মাণকাজ শেষ হলে অথবা বর্ষা শুরু হলে এই ফাঁকির বিষয়টি নির্ণয় করা অত্যন্ত জটিল। এ সকল কাজে মন্ত্রণালয় মনিটরিং টুলস যেমন, পরিদর্শন, অডিট, রিপোর্টিং ইত্যাদি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

প্রকল্প গ্রহণকালীন গৃহীত প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অধিক ব্যয়ে প্রকল্প শেষ করা হয়। এক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ না করে বিভিন্ন অজুহাতে সময় বাড়ানো হয়, যা বন্ধ করা প্রয়োজন বলেও মনে করে দুদক। প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্মাণ সংস্কার মেরামত কাজ সম্পন্নের পরবর্তী একটি যৌক্তিক সময় পর্যন্ত ওই কাজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিজ খরচে বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ওপর আইনানুগভাবে অর্পণ করার সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া, পরামর্শক সংস্থার প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণ ও পূর্বযোগ্যতা মূল্যায়ন করে ঠিকাদারদের নিবন্ধন ও সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন এবং তা ওয়েবসাইটসহ সব মহলে প্রচারের ব্যবস্থা করার তাগিদ দেয়া হয়। ইজিপি অনুমোদন অথবা সুপারিশের ক্ষেত্রে যাতে কোনো জালিয়াতি বা দুর্নীতি না হয় সে লক্ষ্যে ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।

প্রকল্পের ক্রয়, নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে স্বার্থ গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গণশুনানি সামাজিক নিরীক্ষার আয়োজন করার পরামর্শ এসেছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বিল দেবার আগে কাজের পরিমাণগত ও গুণগত মান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। হিসাবরক্ষণ অফিসগুলোতে এ মর্মে একটি নির্দেশনা প্রেরণ করা প্রয়োজন, যাতে সামাজিক নিরীক্ষা সম্পন্ন না হলে কোনো চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা যাবে না।

ওভারলোডিং এর ফলে মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহাসড়কে ‘জীবন সময়’ শেষ হওয়ার আগেই মহাসড়কগুলো বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই ওভারলোডিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের কাজ ওভারলোডিং এর দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মোটরযানের এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১২ এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রকল্পের গাড়ির ব্যবহার নিয়েও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দুদক। বলা হয়, গাড়িগুলো যথেচ্ছ ব্যবহার সড়ক ও জনপথ বিভাগের দুর্নীতির উৎস। প্রকল্পে গাড়ি কেনার যৌক্তিকতা নিরূপণ করেই গাড়ি ক্রয় করা উচিৎ। নির্ধারিত টাইমফ্রেমের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা এবং যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রকল্পব্যয় বৃদ্ধি না করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

বাংলাদেশে সড়ক সংস্কারে বড় ধরনের অনিয়ম হয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনিয়মের কারণে এক সময় এই খাতে সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। তখন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের কাছে তদন্তভার ন্যস্ত করা হয়। তারপর আবার সহায়তা চালু হয়। তিনি আরও বলেন, কাজের যথাযথ মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়াতে হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, সড়ক সংস্কারসহ সকল উন্নয়নমূলক কাজ তদারকির ক্ষেত্রে আইন করা আছে, বিদ্যমান আইনেই দেখভাল করা সম্ভব। মাঠ পর্যায়ে কাজের বাস্তবায়ন করে ঠিকাদার, প্রকৌশলীরা। এক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে গাফিলতি হতে পারে, তার জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.