আবু এন এম ওয়াহিদ : দু’হাজার ছয় সালের মে মাস। আমেরিকার টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটির সাথে তিউনিসিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অফ টিউনিস – এল্ মানার’-এর এক যৌথ গবেষণা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে মাত্র। এ সুযোগে দু’সপ্তাহের জন্য আমাকে যেতে হয়েছিল তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে। সুদূর উত্তর আফ্রিকায় ভূমধ্য সাগরের পাড়ে, লিবিয়া আর আলজেরিয়ার মাঝখানে এক কোটি লোকের ছোট্ট দেশ তিউনিসিয়া। সে দেশের এক বড় অংশ সাহারা মরুভূমি এমনিতে গ্রাস করে ফেলেছে। তার ওপর মরুভূমির বালুর চাদর আগ্রাসি আক্রোশে ক্রমশ বি¯তৃত হচ্ছে তিউনিসিয়ার অবশিষ্ট সবুজ অঞ্চলের দিকে। এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও তিউনিসিয়ার সংগ্রামী মানুষ টিকে আছে যুগ যুগ ধরে। তথাপি স¤প্রতি ঘটে যাওয়া জেসমিন বিপ্ল¬বের আগে, বাংলাদেশের অনেক লোক এ দেশটির নামও জানত না। সে দেশের কথা আমি প্রথম শুনেছি মাত্র ১৯৭০ সালে যখন তৎকালীন জর্ডানের বাদশাহ্ হোসেন বিন তালাল পিএলও এবং ইয়াসির আরাফাতকে তাঁর দলবলসহ জর্ডান থেকে বের করে দেন তখন। ওই সময় তিউনিসিয়া সরকার ইয়াসির আরাফাত ও তাঁর অস্থায়ী ভ্রাম্যমান সরকারকে আশ্রয় দিয়ে সারা মুসলিম বিশ্বের সম্মান ও সুনাম অর্জন করেছিল।

ন্যাসভিল থেকে শিকাগো এবং প্যারিস হয়ে আমি যখন তিউনিস গিয়ে পৌঁছালাম তখন দুপুর গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে মাত্র একটুখানি হেলেছে। কাস্টমস্ এবং ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে আধা ঘন্টার মধ্যে বেরিয়ে এলাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম অ্যারাইভ্যাল এরিয়াতে আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন পেশাগত বন্ধু ও তিউনিসে আমার সেবারকার হোস্ট ‘শিহেব বোডউইন’। টার্মিন্যাল থেকে নেমেই অনুভব করলাম ভর দুপুরে মরুভূমি দেশের লুহাওয়ার উত্তাপ। গাড়িতে ওঠার পরই শিহেব বললেন, ‘সন্ধ্যা নামতে এখনো অনেক দেরি, যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে চল হোটেলে যাওয়ার আগে তোমাকে এক চক্কর তিউনিস শহর ঘুরে দেখিয়ে নিয়ে যাই’। আমি তাঁর প্রস্তাবে সহজেই রাজি হয়ে গেলাম। দেখলাম এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে শহরে যাওয়ার পথ খুব সুন্দর, সাজানোগোছানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে তকতকে। দু’দিকে রাস্তা, মাঝখানে সবুজ আয়ল্যান্ড – হরেক রকমের রঙিন ফুল আর নানা জাতের বাহারি গাছ গাছালি দিয়ে খুব রুচিসম্মতভাবে সাজানো।

শিহেব গাড়ি চালাচ্ছেন, শহর ঘুরেফিরে দেখাচ্ছেন, আর ধারাবাহিক বর্ণনা দিচ্ছেন। এর মধ্যে এক সময় সাগর পাড়েও নিয়ে গেলেন। সাগরের দিকে চোখ তুলে বললেন তিউনিসিয়ার সমুদ্রসৈকতের সঙ্গে ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের ন্যুনতম দূরত্ব মাত্র ত্রিশ-পয়ত্রিশ মাইল। দুঃসাহসী তিউনিসিয়ানরা সাধারণ নৌকো চড়ে ওইপথে ইটালি চলে যায়। তার আগে এক জায়গায় নিয়ে তিনি আমাকে একটি তিন-চার তলা বড় বিল্ডিং দেখিয়ে বললেন সত্তর সালে যখন পিএলওর লটবহর নিয়ে চেয়ারম্যান আরাফাত এদেশে এসে আশ্রয় নেন, এটাই ছিল তাঁর হেডকোয়ার্টার। কথা প্রসঙ্গে এক সময় তিনি গৌরবের সাথে বললেন তাঁরা মহান মনীষী ইবনে খালদুনের উত্তরসুরি। এর আগে আমি জনতাম না ইবনে খালদুনের মত মহান পুরুষের জন্ম হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। সেবার তিউনিস থেকে ফিরে এসে ইবনে খালদুনের ওপর আমার বিশেষ আগ্রহ জন্ম নেয় হয়। কিছু লেখাপড়া করি তাঁর ওপর, এখনো পড়ছি, ইবনে খালদুন বোঝার চেষ্টা করছি। যতই পড়ছি ততই বুঝতে পারছি ইবনে খালদুন কত বড় মাপের ইতিহাসবিদ এবং কত বড় সমাজতাত্তি¡ক ছিলেন!

শিহেবের সাথে গাড়িতে করে তিউনিস ঘুরতে ঘুরতে দেশটি সম্পর্কে আমার মধ্যে একটা দারুণ ইতিবাচক ধারণা জন্মালো। যদিও আমি অর্থনীতির ছাত্র, তবু আমার জানা ছিল না আফ্রিকার কোনো দেশ এত সুন্দর, এত উন্নত হতে পারে। বন্ধু শিহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা এত অল্প সময়ে এত এগিয়ে গেলে কেমন করে’? শিহেব জানালেন, সম্ভবত দুই কারণে, প্রথমত, গত দুই যুগ ধরে তাদের সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা এবং মানব সম্পদের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। দ্বিতীয়ত, তাদের ‘জিওগ্রাফিক প্রোক্সিমিটি টু ইউরোপও একটি বড় ফ্যাক্টার’ – অর্থাত্ ইউরোপের সাথে তিউনিসিয়ার ভৌগলিক নৈকট্য উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁদেরকে কিছুটা হলেও বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বললেন, সকালবেলা প্ল্যান করে তাঁরা দুপুরে প্যারিস পৌঁছে যান এবং কাজ সেরে রাতে ফিরেও আসতে পারেন। ইউরোপের সাথে এই ঘনিষ্ট যোগাযোগ তাদের জনগণের মাঝে একটি আস্থা এবং প্রতিতির জন্ম দিয়েছে, ‘ইউরোপ যদি পারে তো এত কাছে থেকে আমরা পারব না কেন’?

বুঝতে আমার অসুবিধে হলো না, শিহেব আমাকে যে পথে নিয়ে ঘুরছেন সেটা ‘নিউ তিউনিস’ অর্থাত্ তিউনিসের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল এবং নতুন অংশ। নিশ্চয়ই তিউনিসেও ময়লা দুর্গন্ধ, ঘিঞ্জিময় পুরনো অঞ্চলও আছে, আছে গরিবদের থাকার জায়গা, বস্তিতূল্য অঞ্চল। বোধগম্য কারণেই প্রথম দিন তিনি আমাকে সে পথে নিয়ে যাচ্ছেন না।

মনে মনে নতুন ঢাকার সঙ্গে নিউ তিউনিসের তুলনা করলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ১০০’র মধ্যে তিউনিস ৮০ পেলে ঢাকা পাবে বড়জোর ১০ কি ১২, এর বেশি নয়। ২০১২তে তিউনিসিয়ার প্রাক্ষলিত গড় মাথাপিছু জিডিপি হবে বাংলাদেশের ৬ গ্রুনেরও বেশি। তিউনিসিয়ার শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ। এ-সব বিবেচনায় নিয়েও আমি বলতে চাই, বুঝলাম আমরা গরিব, লেখাপড়ায় পিছিয়ে, তার না হয় ঐতিহাসিক কারণ আছে। কিন্তু আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় এত পেছনে পড়ে থাকব কেন? এর কারণ কী? স¤প্রতি লন্ডনভিত্তিক ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক সমীক্ষায় দেখা যায় পৃথিবীর ১৪০টি জনবহুল নগরের মধ্যে বসবাসযোগ্যতার মানদÐে সবার ওপরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন এবং সবার নিচে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, আমার প্রিয় ঢাকা শহর। এর আগে ঢাকার অবস্থান ছিল নিচের দিক থেকে দুই নম্বর – জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারের একটু ওপরে। এখন আমরা সবার নিচে। নোংরামির বিচারে সবার ওপরে। আমার প্রশ্ন, ‘কেন আমাদের এই করুণ দশা’? কে দেবে এ প্রশ্নের জবাব? সরকার, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন? না তাঁরা কেউ নন। এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ঢাকায় বসবাসকারি প্রতিটি নাগরিককে। কেউই এ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। সরকার কিংবা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে এতবড় একটি শহরকে পরিষ্কার করে রাখা সম্ভব নয়। এ কাজে সবার দায়িত্ব সমান এবং সবাইকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে, ঢাকা শহরের মানসম্মান বাঁচাতে হবে।

ঘোরাঘুরি করে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে তখন শিহেব এক দোকান থেকে আমাকে কিছু বোতলের পানি, মিষ্টি ফল, আর শুকনো খাবার কিনে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় তিনি বলে গেলেন, ‘তুমি একটুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গোসল সেরে ইচ্ছে করলে এখানেই এই সব রেস্টুরেন্টে এসে রাতের খাবার খেতে পার’। আমি গোসল করলাম ঠিকই, কিন্তু বেরোতে ইচ্ছে হল না, সফর ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুজে আসছিল। একটি কলা, কয়েক টুকরো বিস্কুট এবং তিন চার ঢোক বোতলের পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সাধারণত বিছানা বদলে আমার ঘুমের সমস্যা হয়, কিন্তু সে-রাতে তেমন কোনো অসুবিধা হলো না। অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে এক ঘুমে ভোর বেলা উঠলাম। সকালে বেসমেন্টে নাস্তা খেয়ে হোটেলের সামনে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ভাবলাম উত্তর আফ্রিকায় প্রথম এসেছি দেশটি কেমন, তার মানুষজন কেমন, একটু দেখি। হোটেলটি যে সড়কের উপর সেটা অনেকটা ঢাকার মিরপুর রোডের মতন। চওড়া রাস্তা এবং যান চলাচলেও বেশ ব্যস্ত।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকালাম। কয়েকটি জিনিস আমার চোখে ধরা পড়ল। প্রথমত, ছোটবড় বাড়ি, বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং সর্বত্র বিল্ডিংএর ছাদে, ঘরের দেয়ালে টিভির ডিশ অ্যান্টেনা। বুঝলাম সবাই স্যাটেলাইট টিভি দেখেন। উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংএর ছাদে, বারান্দায় ও বেলকনিতে লোকজন রঙ-বেরঙের ভেজা কাপড় মেলে দিয়েছেন। বুঝলাম এব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে একটি মিল আছে। আরেকটা বিষয় আমার নজর কাড়ল, সেটা হলো রাস্তায় রিক্সা বা ওই জাতীয় কোনো ধীর গতির যানবাহন নেই। সবাই গাড়িতে চলছে। আরো ভালো করে খেয়াল করে যা দেখলাম তাতে অবাক এবং অভিভূত না হয়ে পারলাম না। গুনে দেখলাম প্রতি ১০টি গাড়ির মধ্যে ৬টির স্টিয়ারিং হুইল ধরে যিনি বসে আছেন তিনি একজন নারী। অর্থাৎ তিউনিসিয়ার মহিলা সমাজ খুব অগ্রসরমান, তাঁরা রান্নাঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ নয়, ঘরের বাইরেও তাঁদের আরেকটি জগৎ আছে যেখানে তাঁরা কাজ করেন, তাঁরা বেশ ফরওয়ার্ড লুকিং এবং আউট গোয়িং প্রকৃতির। চেহারা সুরতে, চলনে বলনে এবং বেশ ভূষায় তিউনিসীয় নারীগণ একেবারে ইউরোপীয়দের মতন। আধুনিক ভাষায় যাকে বলে স্মার্ট।

কতক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার পর হোটেলের উল্টোদিকে কিছুদূর হাঁটলাম। ওদিকে দেখলাম একটি বিশাল আবাসিক এলাকা। সবই বড় ও মাঝারি সাইজের পাকা বাড়ি। সবকটা বাড়িই দেয়ালঘেরা। ভেতরে বাড়ির সামনে আছে সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান। দেখে মনে পড়ল ষাটের দশকের ধানমÐির কথা। ওই সময় ঢাকার ধানমÐি এ-রকমই সুন্দর ছিল – একেবারে ছবির মতন। আবাসিক এলাকায় লোক চলাচল তেমন নেই, নেই ফেরিয়ালাদের হাঁকডাক ও ফকির মিসকিনদের আহাজারি। মাঝে মাঝে দেখলাম বাড়ির সামনে বাগানে লোকজন ফুলগাছের পরিচর্যা করছেন। দু’তিন রাস্তা পরপর ইন্টারসেকশনের কোণায় ছোট ছোট দোকান। এ-সব দোকানে চাল, ডাল, ডিম, রুটি, তেল, পানি, তরিতরকারি, ফলমূল, কুকি-বিস্কুট, চকলেট, ললিপপ ইত্যাদি পাওয়া যায়। এ-ভাবে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারলাম রোদের তেজ বাড়ছে, আর বেশি সময় বাইরে থাকা যাবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হোটেলে ফিরে এলাম।

দুপুরের দিকে শিহেব আসলেন। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে গেলেন। একটি ক্লাসে গেলাম। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বললাম। তাদের সাথে পরিচিত হলাম। তাদের কতাবার্তার ধরণ-ধারণ চিন্তাভাবনার কথা জেনে অবাক হলাম। তারা খুব চটপটে, আধুনিক। আমেরিকার প্রতি তাদের কৌতুহলের সীমা নেই, তবে তারা একেবারেই অন্ধ আমেরিকা অনুসারি নয়। কথাবার্তায় পরিশীলিত, কাপড়েচোপড়ে ভদ্র ও শালীন। তারা চারটি ভাষায় কথা বলতে জানে। আরবী, ফরাসি, ইংরেজি এবং এই তিন ভাষার মিশ্রণে চতুর্থ আরেক ভাষা যার কোনো নাম নেই। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে চারটি নয়, তিনটি নয়, মাত্র দু’টি ভাষা শেখানো হয়, তাও কতিপয় শহুরে স্কুল ছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি তো জানেই না, বাংলাটাও ঠিকমত রপ্ত করতে পারে না। সব মিলে উত্তর আফ্রিকার একটি ছোট্ট দেশ তিউনিসিয়ার সাথে আমার জন্মভূমি বাংলাদেশের তুলনা করে হতাশ হলাম, মনে বড় কষ্ট পেলাম, ভাবলাম, আমরা কখন এমন হব?

লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক – টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি
এডিটর – জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.