কুয়াশা-কৃষি

 কুয়াশা-কৃষি

জায়েদ ফরিদ :

চিলির উপরে রোলিং ফগ

ভারত-বাংলাদেশে এখনও এমন কিছু জলবেষ্টিত জায়গা আছে যেখানকার মানুষ জীবনে কখনো রেলগাড়ি দেখেনি। ‘আটাকামা’ মরুভূমিতে এমন মানুষ থাকতে পারে যে জীবনে কখনো বৃষ্টি দেখেনি। মরুর উত্তরে সামান্য কিছু এলাকা বাদ দিলে এমনও জায়গার সন্ধান পাওয়া যাবে যেখানে ৪০ কোটি বছরেও একফোঁটা বৃষ্টি হয়নি। চিলির অ্যান্ডিজ পর্বতের ঢালে হাজার কিলোমিটার লম্বা পৃথিবীর শুষ্কতম স্থান এই আটাকামা। সেখানে মরু-বৃষ্টি নিয়ে গবেষণারত ডক্টর ‘টাইবর ডুনাই’ বিবিসিকে বলেছিলেন, ওখানে ক্যাম্প করার ৫ দিন পরেও কোনো মাছির দেখা মেলেনি, কারণ খাদ্যের অভাবে কোনো মাছি সেখানে বাস করতে পারে না। অথচ ১০ লক্ষ মরুবাসীদের সেখানে বেঁচে থাকতে হয়, খাদ্য উৎপন্ন করতে হয়।

ফগ-ক্যাচার প্যানেল

এই মরুতে বৃষ্টি নেই কিন্তু কুয়াশা আছে, ভয়ঙ্কর কুয়াশা। ধাবমান এই কুয়াশা দেখে বুক দুরদুর করে, যেন গড়িয়ে আসে এক প্রলয় যাতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা জাগে। এমন কুয়াশা থেকে জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে অনেক মরু উদ্ভিদ। কিন্তু মানুষ এতকাল ধরে এই কুয়াশা-শক্তিকে কাজে লাগাতে পারেনি, কৃতকার্যতার মুখ দেখেছে ৩ দশকের বেশি হয়নি। অ্যান্ডিজ পর্বতের ঢালে মরুর অবস্থান, প্রশান্ত মহাসাগরের ধারে। পূবদিকের আমাজন থেকে ভেসে আসা ভেজা হাওয়া অ্যান্ডিজে ধাক্কা থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে, কিন্তু পর্বতের অন্যদিক রয়ে যায় খটখটে শুকনো। মরু উপকূলে অ্যান্টার্কটিকের শীতল স্রোতের সঙ্গে উষ্ণ হাওয়া মিশে তৈরি হয় ঘন কুয়াশা যা প্রবাহিত হয় আটাকামার উপর দিয়ে। পৃথিবীতে ফগ তৈরি হওয়ার জায়গা নিতান্ত কম নয়, নামিবিয়ার মরুভূমি, মেক্সিকোর ‘বাজা ক্যালিফোর্নিয়া ডেজার্ট’, এমন কি অ্যারিজোনার কৃত্রিম ‘বায়োস্ফিয়ার-টু’তেও তৈরি হয় প্রাকৃতিক ফগ।

প্রাচীনকাল থেকে মরুচারী ইন্ডিয়ানরা ক্যাক্টাসের কাঁটায় জল আটকে থাকতে দেখেছে এবং ভেবেছে; ভাবনার এক পর্যায়ে গাছের ডালে রোমশ পশুচর্ম ঝুলিয়ে সংগ্রহ করেছে জল। যুদ্ধের সময় চিলির পিপাসার্ত সৈনিকরা তাদের রাইফেলের বেয়োনেটে কাপড় ঝুলিয়ে সংগ্রহ করা জল থেকে তৃষ্ণা নিবারণ করেছে। অদ্ভুত আচরণের নামিবীয় বিটল্‌ কুয়াশার আগমনে শরীরের পেছন দিকটা বেশ উঁচু করে রাখে। তার বুটি সংবলিত শরীরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কুয়াশা থেকে জলের কণা সৃষ্টি হয়ে দেহের ঢাল বেয়ে নিচে গিয়ে জমা হয়, একেবারে মুখের কাছে। গাছদের মধ্যেও জলসংগ্রহের নানারকম কৌশল দেখা যায়। কোকোডুমেরের পাম-পাতা থেকে সংগৃহীত পুষ্টিসমৃদ্ধ জল ঢাল বেয়ে গাছের গোড়ায় নেমে যায়। অস্ট্রেলিয়ার মুলগা গাছের নিচে দাঁড়ালে গায়ে তেমন জল পড়ে না, কারণ এই গাছের পাতাগুলো এমনভাবে উর্ধমুখী হয়ে থাকে যে বৃষ্টির জল পাতা থেকে কাণ্ড বেয়ে নেমে যায় শিকড়ের কাছে। প্রকৃতি থেকে অন্বেষণ করা ও জ্ঞান আহরণ করা মানুষের চিরন্তন স্বভাব। তবে প্রাচীনকাল থেকে পাখির উড্ডয়ন দেখে মানুষের আকাশে ওড়ার যতই সাধ থেকে থাকুক, সাধনা করে তাকে উড়োজাহাজে রূপ দিতে আমাদের বিস্তর সময় লেগেছে, যেভাবে সময় লেগেছে কুয়াশা-কৃষির সূচনাতেও।

চিলির বর্তমান এগ্রিকালচার

চিলির ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির অধ্যবসায়ী অধ্যাপিকা ‘পাইলার ক্রেসিডা’ গত ৩০ বছর ধরে অবিরত গবেষণা করে আসছেন কুয়াশা-শক্তি নিয়ে, যার সঙ্গে রয়েছেন ‘এম আই টি’ বিশেষজ্ঞরা। নিকট ভবিষ্যতে কুয়াশা থেকে জল সংগ্রহ প্রযুক্তির পরিণত রূপ হবে কুয়াশা-কৃষি। কিন্তু কৃষিতে মনোনিবেশের আগে প্রাণে বেঁচে থাকতে হবে, যারা কৃষিকাজ করবেন তাদের এবং তাদের গৃহপালিত প্রাণী আলপাকা, লামা ও গবাদি পশুদের। দু’দশক আগে কানাডার ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেভালাপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার’-এর সহযোগিতায় চুংগাংগো গ্রামে প্রথম তৈরি করা হয় কুয়াশা আটকানো ‘ফগ-ক্যাচার’ যা উল্লম্বভাবে দাঁড় করানো ফ্রেম করা একপ্রকার সূক্ষ্ম জাল। এই জালে কুয়াশা ঘণীভূত হয়ে জলকণার আকারে নিচে নেমে গিয়ে জমা হয় চ্যানেলে এবং সেখান থেকে জলাধারে। জল সংগ্রহের কৃতকার্যতা উপলব্ধি করে এক পর্যায়ে এই জলাধারের সঙ্গে যোগ করে দেয়া হয় পাইপলাইন, যা কয়েক কিলোমিটার দূরে গ্রামের মানুষের বসতবাটিতে গিয়ে পৌঁছায়। জরুরি প্রয়োজনটুকু মেটানোর পর, উদ্‌বৃত্ত ‘ফগ-ক্যাচারের’ জল ব্যয়িত হচ্ছে কৃষিতে; শসা, টমেটো, অলিভ, অ্যালোভেরা, আঙুর ইত্যাদি বাগানে।

আটাকামা ডেজার্ট ম্যাপ

২০১৫ সালে, মরক্কোতে সাহারা মরুর কিনারে এ ধরনের একটি ‘ফগ-ক্যাচার’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় যা থেকে ৬০০০ লিটার উৎকৃষ্ট মানের সুপেয় পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। পরে এই প্রকল্পকে বর্ধিত করে যোগ করা হয়েছে ৮ কিলোমিটার লম্বা পাইপলাইন যা গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে পানি সরবরাহ করতে পারে। আগে এসব গ্রামবাসীদের ঘন্টা তিনেক হেঁটে গিয়ে জল সংগ্রহ করতে হত আধা-প্রাকৃতিক জলাধার থেকে। উল্লিখিত এলাকায় প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ট্রাক দিয়েও পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হত। কিন্তু সমস্যা হল, সেই ট্রাক যে কবে কখন পানি নিয়ে আসবে অপেক্ষমান পিপাসার্ত গ্রামবাসীদের তা বুঝতে না পারার কারণে অস্থিরভাবে দিনযাপন করতে হত। ২০১৬ সালে ‘ইউনাইটেড নেশনস্‌’ এই মহতী প্রকল্পকে ‘মোমেন্টাম ফর চেঞ্জ’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করেছে যা বিশ্বের ভবিষ্যত কৃষি-প্রযুক্তির একটি নতুন দিক নির্দেশ করেছে।

নামিবীয় বিটল্‌

এখন আমরা গ্রামাঞ্চলেও সনাতন যাঁতা ঘুরিয়ে কলাই-মসুর ভাঙি না। বিদেশেও উইন্ডমিলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এখন আর শস্য ভাঙানো বা জল তোলার কাজে এদের ব্যবহার হয় না। কিন্তু বন্ধ হলেও একই রকম ঘুর্ণন-প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে লম্বাকাণ্ডের বায়ুচালিত ‘উইন্ড টারবাইন’, যাতে গতিশক্তিকে রূপান্তরিত করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শক্তিতে; যে শক্তির রয়েছে হাজার রকম ব্যবহার। প্রকৃতি থেকে শক্তি সংগ্রহ করার সুবিধা বেশি এবং খরচ অনেক কম। ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রেসিডাও ভেবেছেন, সমুদ্রের নোনা জল থেকে সুপেয় জল তৈরিতে (Desalination) এক কিউবিক মিটারের জন্য এক ডলার উৎপাদন খরচ বর্তমান বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য কষাঘাত। আটাকামা মরু থেকে সার ও বারুদ তৈরির নাইট্রেট ও তামার খনির উৎপাদনের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবেও দরকার হয় প্রচুর জল। পৃথিবীর প্রায় ৩০টি দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে যার উপরের দিকে রয়েছে ইরিত্রিয়া, ইয়েমেন, কেনিয়া, চীন ও মেক্সিকো, তবে শ্রীলঙ্কা ও নেপালও এর ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস।

আমাদের দেশে জলের জন্য কুয়াশা ধরার দরকার হয় না, কিন্তু ঋতু বিশেষে জমিতে জলসেচের দরকার হয়। সেচের জন্য এই জলটুকু আমরা আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখার কথা তেমন ভাবি না। প্লাবনে যে জল আমাদের পীড়িত করে সেই জল অসময়ে ভীষণ জরুরি হয়ে দেখা দিতে পারে। ভূগর্ভের রিজার্ভ করা জলের উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গেছে, দ্রুতই হয়ত তা শেষ হয়ে যাবে। কীভাবে এই প্রাকৃতিক জল সংরক্ষণ করে কাজে লাগানো যাবে তা সুগঠিতভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে আমাদের; জলসাগরে ডুবে থাকি বলে আমরা ভুলে যাই, দুর্দিনের জন্য জল আমাদের কতবড় আশীর্বাদ।
সূত্র : লেখাটি লেখকের ফেসবুক আইডি থেকে নেয়া।

 

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.