মফস্বল সাংবাদিকতা এবং আমাদের গণমাধ্যম

 মফস্বল সাংবাদিকতা এবং আমাদের গণমাধ্যম

জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল : নীচের এই ছবিটি রমজানের ঈদের আগের দিন সন্ধ্যার আগমুহুর্তে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় তোলা। ছবিটি দেখে মনে হতে পারে আঙ্গুল তুলে বুঝি ঈদের চাঁদ দেখানো হচ্ছে।
আসলে তা নয়। দুপুর থেকে অপেক্ষমান সংবাদকর্মীদের এ আঙ্গুল সেতু মন্ত্রীর গাড়ির বহরের দিকে।

বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ যখন ঈদের কেনাকাটা শেষ করে কেউ ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছে, কেউ স্বজনদের সাথে ঈদ উদযাপনের শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত, তখনো সংবাদের খোঁজে ব্যস্ত থাকতে হয় জেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের। শুধুইকি ঈদের আগের দিন? ঈদের সকালে ঈদ জামায়াতের খবর, বিকেলে ঈদ উদযাপনের বিভিন্ন খবর, ঈদের পরদিন থেকে আবারও যোগাযোগ ব্যবস্থার খবর। আরো কতো কি সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে হয় মফস্বল সংবাদকর্মীদের!

সংবাদকর্মী শব্দটি যদিও অনেকের অপছন্দ। কিন্তু কি আর করা, যখন গণমাধ্যমগুলো শুধুমাত্র একটি রাজধানী আর গুঁটি কয়েক বিভাগীয় শহর নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করছে। এর বাইরে জেলা ও উপজেলা থেকে সংবাদ সংগ্রাহক/প্রেরকদের সাংবাদিক বলতে প্রেস্টিজে লাগছে, তখন আমি আর সংবাদকর্মী না বলইেবা উপায় কি? অথচ অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে সংবাদের ক্ষেত্রে রাজধানী আর মফস্বল বলেতে তেমন কোন ভেদাভেদ থাকার কথা নয়।

যা কিছু জানতে পাঠক/দর্শকের আগ্রহ থাকে মূলত তা’ই যদি হয় সংবাদ, তাহলে বলতেই হবে রাজধানী আর মফস্বলে নেই কোন ভেদাভেদ। এখন মফস্বলের সংবাদ দিয়েই পুরণ হয়ে থাকে গণমাধ্যমের অনেকখানি অংশ। আজকাল মফস্বলের অনেক সাংবাদিকই অর্জন করছেন সাংবাদিকতার বিভিন্ন পুরষ্কার ও সম্মাননা।

আমরা প্রেসইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক শাহ আলমগীরের কথা আমরা জানি। জনাব শাহ আলমগীর এদেশের বেশ কিছু ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার বার্তা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ তার পড়াশোনা বাংলা বিষয় নিয়ে। তবে, একথা নি:সন্দেহে বলতে পারি তিনি একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক। এমন অনেক উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে রয়েছে। সুতরাং সাংবাদিকতায় পড়াশোনা না করলে সাংবাদিক বলা যাবে না, একথা বোধকরি পুরোপুরি সঠিক নয়।

সংবাদ সবসময়ই সংবাদ। অতএব, একজন সংবাদ সংবাদকর্মী তিনি তার প্রতিষ্ঠানের কাছে সংবাদ প্রেরক/সংবাদদাতা/প্রতিনিধি/স্টাফরিপোর্টার এজাতীয় ছোটবড় যে উপধিতেই পরিচিত হোননা কেন, যিনি পেশাদারিত্বের সাথে সংবাদ সংগ্রাহ ও প্রেরণের কাজটি করে থাকেন আমার দৃষ্টিতে তিনিই সাংবাদিক।

রাজধানীতে কাজ করা সাংবাদিকরা শুধুমাত্র এ্যসাইনমেন্ট ছাড়া নির্ধারিত বিটের বাইরে খুবএকটা যেতে হয় না। এভাবে একটি গণমাধ্যমের শতাধিক সাংবাদিক একটি রাজধানীর সংবাদ সংগ্রহ করে থাকেন। অন্যদিকে একজন জেলা প্রতিনিধি একটি বিশাল এলাকার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যা আয়তনের দিক থেকে একটি রাজধানীর চে কোন অংশেই কম নয়। অথচ এই বিশাল ভৌগোলিক এলাকার সবধরণের সংবাদ (জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হাজারো বিটের খবর) সংগ্রহ করতে হচ্ছে জেলা প্রতিনিধিকে, একাই!

যদি কুমিল্লার কথাই ধরি, তাহলে এখানকার একজন জেলা প্রতিনিধি মানেই হলো তিনি ১৮টি থানা এলাকার অটো এ্যসাইনমেন্ট মাথায় নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তার উপর আছে মফস্বল বা ন্যাশনাল ডেস্কের পেদানি। এখানে এ্যসাইনমেন্টের কোন বালাই নেই, নেই ছুটিছাটার হিসেব। এদিক থেকে বলতে পারেন বারোমাসই ছুটি। আবার বলতে পারেন দৈনিক ২৪ ঘন্টা, সপ্তায় সাতদিন সর্বোপরি বারোমাসই অটো এ্যসাইনমেন্ট মাথায় থাকে জেলা প্রতিনিধিদের!

ধরুণ আপনি সংবাদের কাজেই কুমিল্লার লাকসামে আছেন, যা জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে। এমতাবস্থায় যানজট শুরু হলো মেঘনা সেতুর উপর, কিংবা সড়ক দূর্ঘটনায় লোক মারাগেলো দাউদকান্দিতে। যা জেলা শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে। কোন ক্রমে খবর পেয়ে বা কোন টিভিতে স্ক্রল/টিকার দেখে আপনার মফস্বল বা ন্যাশনাল ডেস্কের পেদানি কিন্তু শুরু। বুঝতেও চাইবে না দূরত্বের কথা। বুঝবেনা যে হেলিকপ্টার দিয়ে গেলেও এ অল্প সময়ের মধ্যে যানজটের ফুটেজ দেয়া সম্ভব নয় (যদিও এ কারনেই ফাইল ফুটেজ…)। ডেস্ক শুধু চাইবে ফুটেজ আর ফুটেজ এবং লাশের আধিক্য! (একারনেই ফাইল ফুটেজ নামক শব্দটির অপপ্রয়োগ হয়ে থাকে)। আর সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিকুলতাতো আছেই।

এতো কিছু সামাল দিয়ে যিনি একটি সংবাদ তৈরী করে পাঠালেন তাকে সাংবাদিক বলতে নাকি প্রেস্টিজে বাধে! আর সুযোগ সুবিধার কথা নাহয় নাই বললাম। আজকাল অবশ্য অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের সংবাদকর্মীদের সম্মানজনক সুবিধাদি দিচ্ছেন। আবার এ দিক থেকে অনেক প্রতিষ্ঠানের অবস্থাই নাকি শুন্যের কোঠায়!

আমি জানি কেউ কেউ এখানেও প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবেন যে, সুবিধাদি না থাকলে কি করে একজন উপজেলা প্রতিনিধিও চোখের পলকে কোটিপতি বনেযায়? কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, সযোগসুবিধায় যাদের এতো করুণ দশা তারা এ পেশায় থাকেন কেন? আমার কাছে এর সাফ জবাব, কেউ কেউ এ পেশায় আসে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে করেকেটে খেতে! কিংবা টুপাইস কামাবার ধান্দায়। সুতরাং যারা করেকেটে খেতে আসেন তারাতো দু হাতে কামাই করবেই! কোটিপতি হতে আর কতো দিন। আবার কেউ এখানে আসেন সম্মানজনক পেশা হিসেবে। অতএব, সবাইকে একই ওজনে মাপা উচিৎ না।

তবে, সবচে বড় কথা হলো প্রতিষ্ঠান যদি এভাবে যাচ্ছেতাই লোকদের গলায় তথাকথিত সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে না দেয়, তাহলে একজন ব্যাক্তির পক্ষে এ ধরনের অপরাধ করা সম্ভব হতো না। সুতরাং বলা য়ায় ব্যাক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানই বেশি দায়ি। আর রাষ্ট্র দায়ি এধরনের প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়ে ভুয়া কিংবা তথাকথিত সাংবাদিক বানাবার সুযোগ করে দেয়ার জন্যে।

তাই এখনই সময় মফস্বল সাংবাদিকতাকে প্রতিষ্ঠানিক মর্যাদা প্রদান এবং এর যথাযথ মূল্যায়ন করা। পাশাপাশি সাংবাদিক তৈরী করার মেশিন তথাকথিত সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে বেঙের ছাতার মতো গজানো অনলাইন পত্রিকা/অনলাই টিভি/নামসর্বস্ব পত্রিকা বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া। রাষ্ট্র যদি এখনই এ ব্যপারে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ঘরে ঘরে ভূযা সাংবাদিক তৈরী হবে। জনগণের কাছে বির্কিত এবং আস্থাহীন হয়ে হুমকীর মুখে পড়বে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাটি। সেই সাথে রাষ্ট্রকেও একদিন এর জন্যে মূল্য দিতে হবে।

লেখক : পরিচালক, ঐতিহ্য কুমিল্লা (লেখাটি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.