এস এম সৈকত : ধরুন একটি মেয়ের বাবা/মা/অথবা পরিবারের কেউ মারা গেল আর কান্নারত মেয়েটির ‘দুঃখ দূর করার জন্য’ তাকে তৎক্ষনাৎ কেউ বিয়ের প্রস্তাব দিলে ব্যাপারটা কেমন হয়?

কোন স্বাভাবিক মেয়ে এই ধরনের ট্রমাতে থাকাবস্থায় বিয়ের মতন প্রস্তাবে রাজি হতে পারে না। বিপদগ্রস্ত মানুষকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করানো মানে তার বিপদে পড়ার সুযোগ নিয়ে একটা কিছু চাপিয়ে দেয়া।

বাস্তব দুটি উদাহরন দিচ্ছি।

১. কিছুদিন আগে বগুড়ায় ধর্ষিতাকে বিয়ে করার কথা বলে ফাউ পপুলারিটি কামিয়ে নিল এক লোক। সে কি বিজ্ঞাপন ! অনলাইন সব পোর্টালে রাতারাতি সে হিরো আলমের চেয়েও বড় আকারের হিরো হয়ে গেল।

আচ্ছা, ধর্ষণের মতন জঘণ্য একটি অপরাধের শিকার মেয়েটির মাথান্যাড়া করে দেয়ার পর তার মানসিক ট্রমা যে পর্যায়ে ছিল সেখানে কিভাবে কেউ তাকে বিয়ের মতন প্রস্তাব দিতে পারে !

সোজা কথায় মেয়েটি এখন ধর্ষিতা, নিশ্চয় তাকে কেউ বিয়ে করবেনা অথবা সে বাতিল মাল সেন্সেই এই ধরনের কু-প্রস্তাব দিয়েছিল লোকটি। আর সেই লোককে আমরা হিরো বানিয়েছি ! একটা বারও ভাবলাম না একজন নির্যাতিতার সর্বপ্রথমে দরকার মনোসামাজিক ও আইনী সহযোগিতা, স্বামী নামক ঈশ্বর না। বরং বিয়ের নাম করে তার নিজের জীবনের উপর স্বাধীন সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে তাকে আমরা নিয়মিত ধর্ষণের ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছিলাম !

কারন স্বাভাবিকভাবেই তথাকথিত মহামানব সাজা লোকটির কাছে আজীবন সে ধর্ষিতা এবং দয়ার বস্তু হয়ে থাকবে, আর এ সুযোগে সে মেয়েটির পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহনকে কোনদিনই গুরুত্ব দিবেনা।

২. রোহিঙ্গা নারীরা পরিবার পরিজনের লাশের উপর দিয়ে, ভয়ানক অত্যাচার আর দুঃসহ ক্ষুধা নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভিনদেশে এসেছে একটু আশ্রয়ের আশায়।

তাদের এই দূর্বলতার সুযোগে আমাদের দেশী কিছু লিঙ্গ ধার্মিক লোকের মনে হলো এই সুযোগে বিয়ের নাম করে কিছু যৌনদাসী কিনে ফেলা যায় ! তো তারা ‘সওয়াব’ কামানোর উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ে করতে দলবেঁধে শরনার্থী ক্যাম্পে যাবে বলে ঘোষনাও দিয়েছে। বাহ ! লিঙ্গধর্মের জয় হোক।

একটা মহামানবকেও বলতে শুনিনি যে রোহিঙ্গা শিশুদেরকে নিজের শিশুর সাথে মানুষ করবে, কারন শিশু পাললে আপাতত সুবিধা নেই। নারী পালার চিন্তায় যৌনতার লোভ ইনস্ট্যন্ট। আরো সহজ করে ভাবুন, কেউ তো সেই মেয়েগুলোকে ‘বোন’ বানায়নি ! ধর্ম কি তাহলে কেবল বিপদগ্রস্ত নারীকে যৌনতার সম্পর্কে বিবেচনার সুযোগই দিয়েছে?

আমাদের বর্তমান কালের মহামানবেরা সেই ফাউ পপুলারিটি কামানো লোক, কিংবা এইসব লিঙ্গধার্মিকদের মতনই। তাই একটু বুঝে শুনে, খেয়াল করে সমর্থন দেবেন।

লেখক : জাতিসংঘের (UN-Habitat) এর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের তরুণ উপদেষ্টা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.