পুরস্কৃত রিপোর্টারই শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদক নন

 পুরস্কৃত রিপোর্টারই শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদক নন

মোহাম্মদ শাহজাহান : বিনয়ের সঙ্গে একটু সাহস নিয়ে বলছি, পুরস্কার পাওয়া প্রতিবেদনই একমাত্র শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদন নয়। একই সঙ্গে এটাও বলতে চাই পুরস্কৃত রিপোর্টারও একমাত্র শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদক নন। সত্য কথা বলা যায় না সহজে, কিন্তু আমি একটু সহজে বলতে পারলাম এই জন্য যে, আমি রিপোটিংয়ের জন্য দুটি সংস্থা থেকে এ পর্যন্ত দু’বার পুরস্কার পেয়েছি। দুটি পুরস্কারের আর্থিকমূল্য দেড়লাখ টাকা, সার্টিফিকেট ও ক্রেস্ট। পুরস্কার হিসেবে অন্য একটি সংস্থা থেকে একবার একটি মোটরসাইকেলও পেয়েছিলাম। এই সাইকেলের সঙ্গে আমিসহ সংশ্লিষ্টদের ছবি ছাপা হলো, পরদিন পত্রিকায় ক্যাপশন হলো–রিপোটিংয়ে কৃতিত্বের জন্য এই পুরস্কার।
প্রতিবারই পুরস্কার পাওয়ার পর আপন আত্মীয়স্বজন, অফিসের সহকর্মী, বন্ধুবান্ধবদের অসংখ্য অভিনন্দন ও শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়েছি। ভালোবাসা পেয়েছি। আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ কেউ উৎসাহিত করেছেন। আমি সবার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ। সবার উদ্দেশ্যে বলবো-এই যে পুরস্কার ও স্বীকৃতি এই সফলতা শুধুমাত্র রিপোর্টারের একক কর্মের জন্য হয় না। পুরো টিমওয়ার্কের কাজের স্বীকৃতি এই পুরস্কার। রিপোটিংয়ের আইডিয়া দাতা থেকে শুরু করে প্রুফ রিডার সবাই এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাই এই পুরস্কারের কৃতিত্ব ও দাবিদার তাঁরাও।
ঝুঁলিতে এই তিনটি পুরস্কার আসার পর মনে হলো—–এবার একটু আত্মসমালোচনা হলে ক্ষতি কি? তাই বলতে পারেন এটা এক ধরনের আত্মসমালোচনাও। আমি নিজেই আমার সমালোচনা করছি। সর্বশেষ পিআইবি-এটুআই গণমাধ্যম পুরস্কার পাওয়া এবং পরবর্তীতে মানুষের যে প্রতিক্রিয়া ও ভালোবাসা পেয়েছি তাতে মনে হয় এবার সমালোচনা করা ছাড়া আর কি আছে ? সবার প্রশংসা—-ভালো লাগে,,,,,আবার মনে হলো আমার কিছু একটা বলা দরকার। আর তাই মনের অব্যক্ত কথা ফেসবুকে ব্যক্ত করার প্রয়াস মাত্র!
তাই আবারও বলছি, পুরস্কৃত প্রতিবেদনই শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদন নয় এবং যিনি পুরস্কার পেলেন তিনিও একমাত্র শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক নন। যে ক্রাইটেরিয়া বা শর্ত রেখে সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে পুরস্কার দেয়া হয় তাতে অনেক ভালো প্রতিবেদন অনেক সময় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগই পায় না। আবার এমনও হয়, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আপনাকে রিপোর্ট জমা দিতে হচ্ছে। একবছর আগে করা যে রিপোর্ট ছাপা বা প্রকাশ হয়েছে কিংবা টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে সেই রিপোর্ট সংগ্রহ করে জমা দিতে হবে। রিপোর্ট কখন জমা দেয়া হবে কিংবা কারা পুরস্কার দিবে সেজন্য নিয়মিত আবার পত্রিকা ফলো করতে হবে। আরও কত কি নিয়মের বালাই!
এসব নিয়ম-কানুন মেনে অনেক অভিজ্ঞ ও সিনিয়র সাংবাদিকরা প্রতিযোগিতায় অংশেগ্রহণের আগ্রহ দেখান না। আমি অনেককেই চিনি-জানি যারা অনেক ভাল প্রতিবেদন করেন, বড় মাপের সাংবাদিক কিন্তু এসব ঝাঁমেলার কারণে রিপোর্ট জমা দেন না। আবার বিষয়ভিত্তিক প্রতিবেদন চাওয়ার কারণে বেশিরভাগ ভাল রিপোর্ট প্রতিযোগিতায় আসার সুযোগ পায় না। যেসব সংগঠনগুলো সাংবাদিকদের পুরস্কৃত করেন —তাদের এসব বিষয়ে আরও কাজ করার আছে বলে আমার মনে হয়।
সারাবছরই সাংবাদিকরা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার পাচ্ছেন। যারা পুরস্কার পেয়েছেন কিংবা পাবেন তাদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা রাখছি। তবে আবার এমনও আছে—কোন রিপোর্টেরও প্রয়োজন হয় না, আপনি সাংবাদিক কিংবা কোনভাবে মিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন ব্যস হয়ে গেল! অনেকটা যেচে—আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও আপনাকে তারা মনোনীত করবে। লোকজনের সামনে পুরস্কৃত করবে। ক্রেষ্ট প্রদান সমৃদ্ধ এ ধরনের পুরস্কার দেয়ার প্রতিষ্ঠান দেশে এখন অনেক বেড়েছে। বছরখানেক আগে আমাকেও এ ধরনের একটি সংগঠন সাংবাদিক হিসেবে পুরস্কার দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। অনেকটা দিয়েই দেয় পুরস্কার! যাইহোক, আমি অতি বিনয়ের সঙ্গে সেই পুরস্কারটি প্রত্যাখান করতে সমর্থ্য হয়েছিলাম।
তাই আবারো বিনয়ের সঙ্গে বলছি, যারা রিপোটিংয়ে দক্ষতার জন্য পুরস্কার পেয়েছেন কিংবা ভবিষ্যতে পাওয়ার চেষ্টা করছেন নিঃসন্দেহে তাঁরা ভাল প্রতিবেদক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।আবার এটাও ঠিক, যারা কখনো পুরস্কার পাননি কিংবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেননি তাঁরাও শ্রেষ্ঠ ও ভাল প্রতিবেদক-ভালো সাংবাদিক। বিনয়, সম্মান, স্নেহ, ভালোবাসা, আদর এগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এখন। ভালো থাকুন সবাই, সবার জন্য শুভ কামনা।

লেখক : দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিবেদক, (লিখাটি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.