চন্দ্রাহত মেয়েটির কথা

 চন্দ্রাহত মেয়েটির কথা
কোয়েল তালুকদার : মালা নামের মেয়েটি নিতান্তই গ্রামের একটি বালিকা ছিলো । ছোটবেলা় থেকেই ও ছিলো কিছুটা পাগলি স্বভাবের। সে পছন্দ করতো চাঁদ। দশমী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত সে বেশি অস্বাভাবিক থাকতো। নির্জন সন্ধ্যা রাতে পুকুরের পারে বসে দেখতো জলে ভাসা চাঁদ। ঝিরিঝিরি ঢেউয়ের দোলায় চাঁদ ভাসতো, সাথে এই বালিকা মেয়েটির অন্তরও দুলে উঠতো। রাতে কুয়ার জলেও দেখতো চাঁদ। কলসি নামিয়ে দিতো জলে। জলে শুয়ে থাকা সেই চাঁদ কলসির ঢেউয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যেতো।
আমি তখন কৃষি বিভাগে চাকুরী করতাম। একটি এ্যাসাইনমেন্টে তিন মাসের জন্য আমাকে সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে যেতে হয়েছিলো। এই থানাটি চারদিকে নদী বেস্টিত। একদিকে ধলেশ্বরী অন্য দিকে প্রমত্তা যমুনা। এক আষাঢ়ে মেঘের দিনে টাংগাইলের নাগরপুর থেকে নৌকায় করে চৌহালীতে চলে যাই। আমি ওখানে যেয়ে অবাক! নদী ভাঙ্গনের জন্য থানা সদর স্থানান্তর হয়েছে চরের মধ্যে। তখনও কোনো ভবন তৈরি হয়নি ঠিকমতো। অস্থায়ী টিনের ঘরে চলতো যাবতীয় অফিসিয়াল কার্যাদি।
আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো অফিস থেকে অদুরে ধূধূ চরের মধ্য এক গৃহস্থ বাড়ির কাচারি ঘরে। এর জন্য ঐ বাড়ির মালিককে কিছু পে করতে হয়েছিলো। বাড়িটি থেকে পশ্চিম পার্শ্বে যমুনা নদী বেশি দূরে নয়। ভালো লাগছিলো নদী মুখোমুখি এই রকম একটি বাড়ি। আমার অফিসের পিয়ন ছমির আলী ঐ গাঁয়েরই চাঁদ পাগলী মালা নামের এতিম এক বালিকাকে আমার টুকটাক ফয় ফরমাস পালনের জন্য ঠিক করে দেয়।
মেয়েটির বয়স কতোই হবে। এগারো বারো বছর হবে। গরীবের ঘরে মেয়ে হলেও সে ছিলো খুব পরিচ্ছন্ন। চেহারায় ছিলো এক ধরনের সরলতা। খুব মায়া করে কথা বলতো। ওর সাথে আমার কথা বলতে এতো ভালো লাগতো যে, ওকে আমি কখনোই তুই সম্বোধন করিনি। যখন আমি জানলাম মেয়েটি চাঁদ পাগল, তখন আরো বেশি ওর প্রতি আমার আলাদা কেয়ার চলে আসে।
আমার একাকী অবসর সময়গুলোতে এই মালার সাথে কথা বলে কাটাতাম। ছোট ছোট করে ও অনেক কথাই বলতো, অনেক কিছুই জানতে চাইতো। ঢাকায় আমার চার বছরের মেয়েকে রেখে এসেছি, তার কথা মালা শুনতে চাইতো। জিজ্ঞাসা করতো, ও কেমন দেখতে! প্রায়ই বলতো বাবুকে তার কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছা করে। এমনি করেই ওর সাথে কথা বলতে বলতে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে মালা আমার ভালো ক্ষুদে বন্ধু হয়ে উঠলো।
একদিন বিকাল থেকেই মালা আসছিলোনা। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরে বসে আছি। তারপরও ও আসেনি। আমি ঘর থেকে বের হই। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়েছে। পূর্ব আকাশে দেখলাম দশমীর চাঁদ উঠেছে। চরের চরাচর জুড়ে জ্যোৎস্না নেমে পড়েছে। আমি হেটে হেটে মালাদের বাড়ির দিকে যাই। ওখানে যেয়ে শুনি, সন্ধ্যা থেকেই সে ছোট্ট পুকুর পারে বসে ছিলো। ঐসময়ে সে নাকি কারো সাথে কথা বলেনা। দেখলাম বাড়ির বারান্দায় মাদুর পেতে মালা শুয়ে আছে। আমি ওকে ডাকলাম, কিন্তু শুনলোনা। কথা বলতে চাইলাম, কথাও বললোনা।
পরের তিন দিনও মালা আসেনি। আমার খুব ইচ্ছা হলো, একদিন সন্ধ্যা রাতে ওর সাথেই আমি পুকুর পারে বসে থাকবো। দেখবো চাঁদের সাথে ও কিভাবে সময় কাটায়। সেদিন ছিলো পূর্ণিমার রাত। বাড়ির কাচারি ঘর হতে বের হয়ে কাশবনের পাশ দিয়ে হেটে হেটে মালাদের বাড়ি যাই। যেয়ে দেখি মালা নেই। সন্ধ্যাই সে নদীর তীরে চলে গেছে। মালার মা মেয়ের সাথেই রয়েছে। আমি আর নদীর তীরে যাইনি।
চার পাঁচটি দিন মালার অভাব আমি খুব অনুভব করছিলাম। আমার ঘরে ঠিকমতো রান্না হয় নাই। প্রতিদিনের একাকী বিকেলগুলো ঘরের মধ্যেই শুয়ে বসে কাটিয়ে দেই। যে মেয়েটি আমার সাথে ছোট ছোট করে কথা বলে আমার সময় পার করে দিতো, সে আজ চারদিন ধরে নেই। কি এক চন্দ্রালোক তাকে এই জগৎ থেকে আলাদা করে রেখেছে, সে এক বিস্ময়ই শুধু।
এক মাস পার হতেই হেড অফিস থেকে হঠাৎ টেলিগ্রাম পেলাম, আমাকে আবার ঢাকাতে থাকতে হবে এক মাস। আমি পরের দিন সকালে ঢাকায় চলে আসার প্রস্তুতি নেই। মালাই আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিলো। মালা বলছিলো — ‘দাদাভাই, আপনি আর আসবেন না?

আমি : এক মাস পরে আসবো।

মালা : আপনি আমাকে সাথে করে নিয়ে যান। আমি বাবুকে দেখে রাখবো। ঘরের কাজ সব করে দিবো।’

আমি : ঠিক আছে, তোমাকে আমি নিয়ে যাবো। তবে এবার না। আমি তোমার আপার সাথে আলাপ করে আসবো। এর পরেরবার আমি যখন একেবারে এখান থেকে চলে যাবো, তখন তোমাকে নিয়ে যাবো। ‘

মালা : আচ্ছা।

একমাস ঢাকায় থেকে আমি আবার চৌহালী চলে আসি। পিয়ন ছমির আলী কে বললাম, মালাকে খবর দিতে যে, আমি এসেছি। ও যেনো আমাকে একটু দেখভাল করে। ছমির বললো – ‘স্যার, মালা খুব অসুস্থ। ও এখন চলাফেরা করতে পারেনা। ‘

আমি : কি হয়েছে ওর?

ছমির আলী : আপনি চলে যাবার পরপরই ওকে ময়মনসিংহে এক সাহেবের বাসায় কাজ করতে পাঠিয়েছিলো। পাঁচ দিন ওখানে ছিলো। তারপর অসুস্থ হয়ে সে ফিরে আসে। ‘
আমি : ওহ! তাই।

হেড অফিসের সিদ্ধান্তে চৌহালীর এই এ্যাসাইন্টমেন্ট তাড়াতাড়ি ক্লোজ করতে হ্চ্ছে। এবং তা আগামী আট দশ দিনের ভিতরেই। আমি ছমির আলীকে বললাম, মালার এ্যাবসেন্টে সেই যেনো আমার একটু দেখভাল করে। কাজের ব্যস্ততার কারণে আমি আর তিন চার দিন মালার কোনো খোঁজখবর নিতে পারি নাই। মালাই একদিন বিকেলে ওর মার সাথে আমার এখানে চলে আসে। ওকে দেখার পর আমার মনটা হাহাকার করে ওঠে। একি অবস্থা মালার! একদম শুকিয়ে গেছে। মায়াবী সেই চোখ দু’টো কোঠরে চলে গেছে। চোখের নীচের পাতা কালচে হয়ে গেছে।

মালা’র মা বলছিলো, আপনি এসেছেন একথা শোনার পর মালা আপনাকে দেখার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিলো। ও বলছিলো — ‘আমাকে দাদা ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাও। ‘ মালা ছলোছলো চোখে আমাকে দেখছিলো । ও বসে থাকতে পারছিলোনা, ওর মা মালা’কে বুকের পাজরে ধরে বাড়ি নিয়ে যায়। মালা যখন চলে যায় তখন সন্ধ্যা। আমি ওর চলে যাবার সময়ে অতোটুকু খেয়াল করিনি। চলে যাবার পরপরেই দেখি – যে পথ দিয়ে মালা হেটে হেটে চলে গেছে, সেই পথে টপ টপ করে তাজা রক্ত মাটিতে পড়ে আছে। ছমির আলীর মুখে পরে জানতে পারি– মালা ময়মনসিংহে একাধিক বার ধর্ষিত হয়েছিলো।

ছমির আলী আরো বললো, মালা আগের মতো চাঁদ দেখে আর ঘরের বাইরে যায়না। বিনম্র হয়ে শুয়ে থাকে বিছানায়। মেয়েটির জন্য কেন জানি খুব মায়া হলো। অন্তর টা হুহু করে কাঁদতে লাগলো। আমারও তো ছোট্ট একটি মেয়ে আছে। মালার মুখচ্ছবিতে আমার মেয়ের মুখ দেখতে পেলাম। বেতনের টাকা উঠিয়েছিলাম, সেখান থেকে ঢাকা যাবার সামান্য টাকা রেখে বাকিটা ছমির আলীর মারফতে মালা’র মা’র কাছে পাঠিয়ে দিলাম।

অফিসের ব্যস্ততার জন্য আমি আর মালাদের বাড়ি যাই নাই। সেদিন বিকাল থেকেই একটু অবসরে ছিলাম। অফিসের কাজও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। একাকী বসে আছি। ভালো লাগছিলোনা কিছুই। যে মেয়েটি থাকলে ওর সাথে ছোট্ট ছোট্ট করে কথা বলে সময় কাটাতাম, সেই মেয়েটি আজ নেই। ঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে বুঝতে পারি নাই। হারিকেনটাও জ্বালানো হয় নাই। মালা থাকতে সন্ধ্যা আলোটা ঐ জ্বালিয়ে রাখতো। মালা নেই তাই ঠিকমতো সন্ধ্যা বাতিটাও জ্বলে ওঠেনা। হারিকেনের কাঁচের চিমনি ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে।

সন্ধ্যার পর ঘর হতে নেমে আসি। সারা চর জুড়ে সন্ধ্যা রাতের নির্জন পূর্ণিমার চাঁদের অন্ধকার। সমস্ত কাশবন জ্যোৎস্নায় ছেয়ে গেছে। একবার মনে হলো হাটতে হাটতে যমুনা তীরে চলে যাই। যেয়ে যমুনার জলে চাঁদের মুখ দেখি, কিন্তু ওদিকে আর গেলামনা। মালার করুণ মুখখানি মনে পড়তে লাগলো। আমি চলে যাই মালাদের বাড়ি। মালা মাদুর পেতে বারান্দায় শুয়েছিলো। আমি কাঠের একটি টুলে ওর পাশে বসি। ওকে বলি – ‘মালা,আজতো আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। পুকুরের জলে চাঁদ দেখবেনা? ‘
মালা : ‘দাদা ভাই, আপনি আমাকে একটু ধরে পুকুরের পারে নিয়ে যান। আমি চাঁদ দেখবো আজ। ‘
আমি সেই সন্ধ্যা রাতে মালাকে ধরে পুকুর পারে নিয়ে গিয়েছিলাম। পাড়ের দূর্বা ঘাসের উপর বসে ও কিছুক্ষণ জলের উপর চাঁদ দেখেছিলো।

পরের দিন সকালবেলা ছমির আলী এসে আমাকে খবর দেয় – ‘মালা রাতেই মারা গেছে।’ এরপর আরো দুইদিন আমি চৌহালীতে ছিলাম। তৃতীয় দিন ঢাকায় চলে আসার প্রস্তুতি নেই। আজ আর আমার ব্যাগটি কেউ গুছিয়ে দিলোনা। আমিই গোছালাম। ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে যখন ঘর হতে বের হচ্ছিলাম, তখন পাশ থেকে মালার কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম — ‘দাদাভাই, আপনি আমাকে সাথে করে নিয়ে যান। বাবুকে দেখে রাখবো। ঘরের কাজ সব করে দিবো। ‘
খেয়াঘাটে এসে নৌকায় উঠে বসি। ধলেশ্বরীর প্রবল ভাটির স্রোতে নৌকাটি ভেসে যাচ্ছিলো নাগরপুরের দিকে। পাড়ের গ্রাম, আর বৃক্ষ শৈলীর দিকে তাকিয়ে চন্দ্রাহত সেই মেয়েটির কথা খুই মনে হচ্ছিলো। দূরে কোন্ নৌকার মাঝি গাইছিলো তখন —

” তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার।
তাই জনম গেল, শান্তি পেলি না রে মন, মন রে আমার।
যে পথ দিয়ে চলে এলি, সে পথ এখন ভুলে গেলি–
কেমন করে ফিরবি তাহার দ্বারে, মন, মন রে আমার।”

লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.