সজীব ওয়াফি :

জন তিরিশেক মানুষ। নাফ নদী পেরিয়ে তিনটা নৌকায় আসতেছে এপারের দিকে। নারী, শিশু আর বৃদ্ধ। নৌকায় পুরুষ বলতে দুইজন। চার বছরের ছোট তারিক কে জড়িয়ে ধরে বসে আছে আনোয়ারা। চুলগুলা আউলা ঝাউলা, দেখতে পাগলের মত। ভয়াতুর চোখে তারিক মাকে জিগ্গাস করতেছে :
– মা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
– ওপারে যাচ্ছি বাবা, তোমার ভাইদের কাছে !
– ওপারে ভাইয়ারা থাকে?
– হুম। ওপারের মানুষ তোমার ভাই হয়।
– ওরা আমাদের মারবে না তো ?
– না বাবা, তারা অনেক ভালো !
বিমূঢ় হয়ে বসে আছে আনোয়ারা। বার বছরের মেয়েটাকে শেষ রক্ষা করতে পারেনি অভাগি। ভয় ভয় চোখে তারিক মায়ের দিকে চেয়ে আবার জানতে চায় :
– মা ওদেশের ভাইয়ারা আমাদের শরীরে আগুন দেবে না
তো?
আনোয়ারা নির্ভয়ে সান্ত্বনা দেয় ছেলেকে
– না রে বাবা! ওদেশের মানুষ তোমার বাবার মতো।
তোমাকে তারা আদর করবে।
যখন খেলতে ইচ্ছে হবে তখন খেলতে পারবে।
.
গতরাত থেকে এত ঝড়-ঝাপটা
গিয়েছে যে কিছুই মনে ছিল না
ছোট্ট
তারিকের। হঠাৎ তার বাবার কথা মনে হতেই আধো আধো
জিগ্গাস করে তারিক
– মা, বাবা কোথায় ?
ছলছলিয়ে পানি জমে ওঠে আনোয়ারার চোখে।
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
কপালে আলতো চুমু খায় –

তোমার বাবা নতুন বাড়ি ঠিক করতে
গেছে বাবা।
মা ঠিক জানে, ওর বাবা আর ফিরবে
না। দু’দিন আগেই চলে
গেছে না ফেরার দেশে। তাঁর শেষ
কথা ছিল
– ‘বাঁচতে চাইলে ছেলেকে নিয়ে পালাও।’
.
নৌকা তিনটি নাফ নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলেছে সন্তর্পণে।
ঐ তো
সামনে
বাংলাদেশ !
হঠাৎ শোরগোল বেধে গেল। বিজিবি নৌকা
ঘিরে ধরেছে। এরা রোহিঙ্গা। ঢুকতে দেয়া
যাবে না এদের। “পুশব্যাক” করাতে
হবে। উপরের নির্দেশ। অভুক্ত, অসহায় নৌকার যাত্রীরা
উৎকন্ঠিত।
ফিরিয়ে দেবে না তো তাদের?

আহাজারি রুপ নিয়েছে নৌকায়।
এক বৃদ্ধা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো

“আমাদের বাঁচতে দিন। আপনারা তাড়িয়ে দিলে আল্লাহর দুনিয়ায়
আমাদের কোন স্থান থাকবে না
।”
.
তারিকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এলেন আনোয়ারা।
শুকিয়ে যাওয়া চোখে টলমল করছে
অশ্রু

আমরা ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু দয়া করে আমার
বাচ্চাটিকে নিয়ে যান।
নির্মম কঠোর চাহনি ফিরে
পেল হতভাগি। কোলে তার সেঁটে
যাওয়া ভীরু সন্তান। নৌকা চললো ফের
আরাকানের দিকে।

মা, আমরা আবার কোথায় যাচ্ছি ?
নীরব হয়ে গেছে আনোয়ারা। মুখে কোন উত্তর নাই এবার।

ওরা কি আমার ভাই না? তুমি না বললে ওরা
আমার বাবার মতো !
মায়ের চোখে নিথর দৃষ্টি। চোয়াল
শক্ত করে বললো,

তোর ভাইয়েরা
মরে গেছে। পৃথিবীর কোথাও
তোর ভাই নেই।

বাবা কি নতুন বাড়ি খুঁজে পাবে?

আমরা সেই বাড়িতেই যাচ্ছি বাবা। তোর
বাবার কাছে!
টপটপ করে চোখ থেকে জল পড়ছে আনোয়ারার। মায়ের এ জল শুকাবার নয়।
.
বাংলাদেশে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, কর্মসংস্থান সমস্যা আগেও ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। অনেকে পার্বত্য এলাকায় গণহত্যা, সাওতাল পল্লী, নাসিরনগর, বানভাসী মানুষের দুরাবস্থা টেনে এনে রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে দাড় করাতে চেস্টা করছেন; এত সহজেই ভুলে গেলেন, সেদিন কেউ আপনাদের পক্ষে কথা বলেনি !!!
ভেবে দেখবেন —
“সেদিন সাওতালরা বিপদে পরেছিল, চুপ থেকেছেন; হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিছে, মুখে কুলুপ এটেছেন; বানভাসী মানুষ আপনার কেউ হয় না, হাত গুটিয়ে রেখেছেন; ব্লগার কুপিয়ে মারতেছে, তারা আপনার ভাই না; পার্বত্য গণহত্যা হচ্ছে, তারা তো আদিবাসী; রোহিঙ্গা মরতেছে, তারা আপনার দেশের না; এই ধরনের অজুহাতিদের সন্ত্রাসী যেদিন ধরবে দেখবেন আপনাকে সাহায্য করার মত কেউ বেচে নেই।”
ওপারে গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুটপাট, জ্বালাও-পোড়াও দেশ ত্যাগের মত ঘটনা ঘটতেছে। দূরত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ খুবেই পাশে। মানুষের এ ঢল ফেরানো কস্টকর। মানুষের মৃত্যুর এঅবস্থায় যদি বলেন তাদের আশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই আসে না, রোহিঙ্গাদের পক্ষে বলা আবেগ ছাড়া কিছু না; তাহলে বুঝতে হবে আপনার মত জানোয়ার আর নাই। সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সবচেয়ে বড় কথা ওপারে মানুষ মরছে।
সূত্র : লেখাটি লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.