বাঁশের অপব্যবহার

 বাঁশের অপব্যবহার

বাঁশ তৃণজাতীয় গাছ। অন্যান্য তৃণের সঙ্গে পার্থক্য- বাঁশ যথেষ্ট শক্ত, সহজে ভাঙে না। তাই পর্ণকুটিরের খুঁটি, বেড়া, সাজ-সরঞ্জামে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। বাঁশ দিয়ে এখন খাট, সোফা, চেয়ার, টেবিলসহ নানা শৌখিন দ্রব্য তৈরি হচ্ছে। বাইরেও রফতানি হচ্ছে বাঁশের তৈরি শোপিস। কাগজ তৈরির উপাদানও বাঁশ।
বাঁশ থেকে লাঠি হয়, আবার বাঁশিও। বাঁশের লাঠি হাতে চর দখল দেখেছি। আবার বাঁশের লাঠি হাতে জনতার প্রতিরোধও দেখেছি। একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক সমাবেশে জনতা লাঠি হাতেই সমবেত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, যার যা কিছু আছে তা দিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। জনতা তখন বাঁশের লাঠি উঁচিয়ে ধরেছিল। সে বাঁশের লাঠিই মুক্তিযুদ্ধে রাইফেলে পরিণত হয়েছিল। তখন বাঁশিওয়ালার বাঁশিও ভাবগীতের সুর মূর্ছনায় বিভোর থাকেনি। নতুন সুর ঝঙ্কার তুলেছিল। সত্য হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহী কবির সেই অমরবাণী- ‘মোর এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’।
বাঁশের ব্যবহার বহুমুখী। কিন্তু এর অপব্যবহারও কম নয়। ইদানীং ভবন নির্মাণে লোহার রডের বদলে বাঁশের চটা ও কঞ্চি ব্যবহারের অভিনব ঘটনাও ঘটছে। গত ১৯ মার্চ সমকালসহ কিছু সংবাদপত্র বান্দরবান সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবনের দেয়ালে কঞ্চি ব্যবহারের সচিত্র সংবাদ প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে নির্মাণাধীন ভবনটির দেয়ালেই নয়, ছাদেও বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অপকর্মের হোতা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নাম জানা যায়নি। এটি জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃর্পক্ষ। বোঝা যাচ্ছে, কত বড় ‘কালকেউটের’ প্রতিষ্ঠান যে সেটির নাম বলার ক্ষমতা নেই কর্মকর্তাদের। তবে ভবন নির্মাণের কাজ দেখছেন ঠিকাদার উজ্জ্বল দাশ ও তাপস কান্তি দাশ, যারা আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাও বটে। তারা বলেছেন, মিস্ত্রিরা তাদের সুবিধার জন্য এটি করতে পারেন। তাহলে ব্যাপারখানা কী এমন যে, মিস্ত্রিরাই লাভের ধন ঘরে তুলবেন, আর ঠিকাদার সাহেবরা আঙুল চুষবেন!
নির্বাহী প্রকৌশলীর ভাষ্যমতে, কাজ দেখভালের জন্য একজন সাইট ইঞ্জিনিয়ার দায়িত্বে ছিলেন। সঙ্গতভাবে প্রশ্ন এসে যায়, তিনি কী দায়িত্ব পালন করছিলেন। দায় কি এড়াতে পারবেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা? করুণা হয় কলেজের অধ্যক্ষ প্রদীপ কুমার বড়ূয়ার জন্য। তিনি বলেছেন, কাজ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তাকে কোনো কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। কাজ শেষে তার স্বাক্ষরও নেওয়া হয় না। একজন অসহায় শিক্ষকের সরল স্বীকারোক্তি। বেচারা কী করবেন! তার গর্দানে কয়টা মুণ্ডু যে ক্ষমতাধরদের সঙ্গে যুঝবেন?
এমন ঘটনা প্রথম নয়। এর আগে রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা ও গাইবান্ধায় স্কুল ও সরকারি ভবনে রডের বদলে বাঁশ ও কঞ্চির ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ওই পর্যন্তই। এসব অপকর্মে কারও শাস্তি হয়েছে বলে জানা যায়নি। তারা বহাল তবিয়তেই আছেন। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে বান্দরবানে এর পুনরাবৃত্তি হতো না।
এসব অপকর্মের হোতাদের রয়েছে খুঁটির জোর। সেটি অবশ্য বাঁশের খুঁটি নয়; পাকা খুঁটি, ক্ষমতার বলয়ে পোঁতা খুঁটি। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে উদ্ধৃত করতে হয়। তার ভাষায়- দলে ফার্মের মুরগি ও কাউয়া ঢুকে গেছে। না, কেবল কাউয়া নয়, রক্তচোষাও ঢুকেছে। তবে সব রক্তচোষা যে সরকারি দলের তা নয়, বিরোধী দলেও আছে। ক্ষমতার ভেতরে বা বাইরে যেখানে থাকুক, ওরা গণশত্রু। মনে রাখতে হবে- যারা ভবনে রডের বদলে বাঁশ দেয়, মানুষ চাপা পড়ার কথা ভাবে না- তারা মনুষ্য সমাজের কলঙ্ক।
আমরা সুন্দর ভবিষ্যতের প্রয়োজনেই এসব অপকর্মের হোতাদের কঠোর, কঠোরতর শাস্তি দাবি করছি।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.