বশিরানন্দ দাশ ও সোমলতা সেন

 বশিরানন্দ দাশ ও সোমলতা সেন

মাসকাওয়াথ আহসান : 

বিজ্ঞাপনী সংস্থার গাড়িটা বশিরকে কোচ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যায়। বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রধান অরণ্য আসিফ ভাই বশিরকে অবশ্য বলেছিলেন গাড়িটা নিয়েই রাজশাহীতে ঈদ করতে যেতে। কিন্তু বশির তার সবুজ শহরটার পরিবেশ দূষণ করতে চায়না। রিক্সায় চড়তে চায় অথবা হাঁটতে চায়।

অরণ্য ভাই বশিরের এইসব আজগুবি পরিবেশবাদী আচরণ আজকাল সহ্য করে নিয়েছেন। বশির তার ঈদ বোনাস অফিসের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটিজ ফান্ডে জমা দিয়ে দিয়েছে। তা দিয়ে শিশুদের ঈদের নতুন জামা উপহার দেয়া হয়েছে।

অরণ্য ভাই তাই অনেক সাধাসাধি করেন বাড়তি টাকা নিয়ে যেতে। বশির বলে দেয়, রাজশাহীতে সবাই আপ্যায়ন করে, বন্ধুরা পকেটে হাত দিতে দেয়না। সামান্য রিক্সাভাড়া ছাড়া কিছুই লাগে না; আবার বন্ধুরাই অনেকে বাসায় মোটর বাইকে করে পৌঁছে দিয়ে যায়।

অরণ্য ভাই জিজ্ঞেস করেন, বশির সত্যি বলছো না বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট ফেঁদেছো!

বশির বলে, এবারই চলেন; হাতে নাতে প্রমাণ পেয়ে যাবেন।

অরণ্য ভাইয়ের ডিসিশান ফাইনাল। উনি রিটায়ারমেন্টের পর রাজশাহীতেই সেটল করবেন।

কোচে উঠে বশির ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নিজের সিট খুঁজতে থাকে। জানালার পাশে সিট। সেখানে গিয়ে দেখে এক তরুণী বসে। বশিরকে দেখে সে বলে, আমি জানালার পাশে বসে যাবো। আপনি আমার সিটে বসেন।

এরকম অসংখ্য অন্যায় বশিরের সঙ্গে প্রতিদিন ঘটে। সে মুখবুঁজে সহ্য করে। এই অন্যায়টাও সহ্য করে নেয়। তরুণী বশিরকে গম্ভীরভাবে বসে থাকতে দেখে বলে, ঈদের ছুটিতে একটা এতো স্মার্ট তরুণীর সঙ্গে পাশে বসে যাচ্ছেন; মুখটা এমন বাংলা ৫ এর মত করে রেখেছেন কেন!

বশির কোন উত্তর দেয়না। চুপচাপ বসে কোচ ছাড়ার অপেক্ষা করে। সামনের সিটে এক নব বিবাহিত জায়া ও পতি প্রজাপতিদের মতো খুনসুঁটি করছে। বাম পাশের সিটে এক হুজুর বেশ হাসি হাসি মুখ করে বসে।

পেছনের সিটে এক মাঝবয়েসী দম্পতি বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মতো চাপানোতর বিতরণ করছে।

বশিরের পাশের তরুণীটির নাম সোমা। কিন্তু ফেসবুক থেকে যদি খুঁজে ফেলে; তাই নিজের পরিচয় দেয়, আমি সোমলতা সেন। আমি নাটোরে যাচ্ছি। আপনার নাম কী!

বশিরও ফেসবুকে অযথা ঝামেলা এড়াতে নিজের নাম বলে বশিরানন্দ দাশ।

সোমা বুঝতে পারে বশিরের রসিকতা। সে গড় গড় করে বলতে থাকে,

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন ।

কবিতার প্রতি বশিরের সব্বোনেশে দুর্বলতা। সোমার কন্ঠের আবৃত্তি শুনে বশির জানালার পাশের সিট হারানোর দুঃখটা অনেকটা ভুলেই যায়।

কখন কোচ কালিয়াকৈর এসে পড়েছে দু’জনেই খেয়াল করেনি। সামনের দম্পতি তাদের ম্যারাথন হাসি-গল্প জারী রেখেছে। পেছনের সরকারী দল-বিরোধী দল দম্পতির ঝগড়াও থেমে নেই।

কোচের লাউড স্পিকারে গান বাজছে বলে হাসি-গল্প-ঝগড়ার আওয়াজ তত স্পষ্ট নয়।

হুজুর বশিরকে জিজ্ঞেস করে, তা ভাইজান কী করা হয়!

বশির বিজ্ঞাপনী সংস্থা কী জিনিস তা বোঝানোর ঝামেলায় না গিয়ে বলে, কিছু করিনা।

বশির কিছু করে না শুনে হুজুর খানিকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু আগ্রহ তৈরি হয় সোমার মাঝে। কারণ যে তার নাম বশিরানন্দ দাশ বলে; সে নিশ্চয়ই ইন্টেরেস্টিং কোন কাজ করে। কিন্তু আধুনিক যুগে ব্যাপারটা আউটডেটেড বলে সোমা আর বশিরকে জিজ্ঞেস করে না সে কী করে!

হঠাত হুজুর গলাখাঁকারি দেন, নামাজের ওয়াক্ত হইছে; ড্রাইভার সাহেব গান-টান বাদ দিয়া আজান বাজান। আপনি দেখতেছি নিজেও দোজখে যাইবেন; আমগোও দোজখে নিবেন।

ড্রাইভার হেসে বলেন, ঠিক বলছেন হুজুর। যতক্ষণ আমি এই কোচটা চালাইতেছি; দোজখে নেওয়ার ভয় তো আছেই। গান শুনে রাত জাগি হুজুর। যাত্রীদের স্বার্থেই।

হুজুর ভয় পেয়ে যান। আজান বাজানো শেষ হলে হুজুর নামাজ পড়েন। তারপর হুজুর ড্রাইভারকে হেসে বলেন, ভাইজান গান শুনেন। ঘুমাইয়া পইড়েন না যেন।

সোমা বশিরকে জানায় সে একজন সাংবাদিক। একইসঙ্গে নারীবাদী।

নারীবাদী শুনে বশির সরে গিয়ে সিটের একপাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে। সোমা জিজ্ঞেস করে, আপনি এমন করছেন কেন! স্বাভাবিক হয়ে বসুন।

বশির বলে, নাহ নাহ ঠিক আছে; অসাবধানতায় আপনার সঙ্গে ধাক্কা লেগে গেলে; আপনি বাড়ি ফিরেই ফেসবুকে রসিয়ে রসিয়ে বশিরানন্দ দাশ কতটা খারাপ পুরুষ তা নিয়ে একটা স্টেটাস দিয়ে কিছু লাইক কিছু এঙ্গার ও অঙ্গার জোগাড় করে ফেলবেন।

সোমা হেসে বলে, দাঁড়ান আপনার একটা ছবি নিয়ে নিই।

বশির আবার বিরক্ত হয়ে বসে থাকে।

সোমা বশির গম্ভীর হয়ে থাকায় তাকে হুবহু কপি করে গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। হুজুর দুজনকে গম্ভীর হয়ে বসে থাকতে দেখে বলেন, আপনাদের রিলেশানটা বুঝি ভালো যাচ্ছে না। দুইজন মিলে একটু আজমীর শরীফ ঘুইরা আসেন। মনটা ভালো লাগবে।

বশির স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে। ঝগড়াটে মহিলা পেছন থেকে সোমার ঘাড়ের কাছে এসে বলেন, এই ঈদে সিঙ্গাপুরে ঘুরতে গেলেই পারতে। দেখতে ঝগড়া হতো না।

এমন সময় বিকট আওয়াজ হয়। হুজুর দরুদ শরিফ পড়তে থাকেন। খবর আসে টায়ার পাংচার হয়েছে। ঠিক এ সময় বশিরের মায়ের ফোন আসে, হ্যালো তোমাকে এতো করে নিষেধ করলাম ঈদের এই জ্যামের সময়টাতে এতো কষ্ট করে আসার দরকার নাই। তুমি তো সব সময় নিজের খেয়ালখুশী মতো চলো। আমাদের টেনশান হয় বাবা।

সোমা ফোনের কাছে এসে বলে, হ্যালো জানেন আন্টি এখন কোচের টায়ার পাংচার হয়েছে। আরও কী কী যে হবে সামনে!

বশিরের মা বলেন, তাতো হবেই; যোগাযোগ ব্যবস্থাটা আর তো উন্নত হলোনা। তা তুমি কে! বশিরের পাল্লায় পড়লে কীভাবে!

পাল্লায় পড়ার কথা শুনে সোমার এতো হাসি পায় যে আর কথা বলতে পারেনা। বশির তার মাকে বলে, মা ইনি সোমলতা সেন। কোচেই পাশাপাশি সিট পড়েছে। উনি নাটোরেই নেমে যাবেন।

মা বলেন, বাব্বাহ! নাটোরের সোমলতা সেন।

বশির ফোন শেষ করে কোচ থেকে নীচে নামে। পেছনের ভদ্রমহিলা সোমাকে বলেন, ছেলেটা অনেক রাগ করেছে; তোমাকে না নিয়েই চা খেতে চলে গেলো।

সোমা চায়ের দোকানে এসে বশিরের পাশে বসতেই দোকানদার এক কাপ চা এগিয়ে দেয়।
–নেন ভাবী আপনার চা।
সোমা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, এই জায়গাতেই আমার অবজেকশান; লোকজন ভাবী ডাকতে শুরু করে।

বশির বলে, এ সমাজের আরো অনেক সময় লাগবে কোন কিছু ধরে নেয়ার বা অনুমান করার এই বাতিক থেকে বেরিয়ে আসতে।

এমন সময় এক পুলিশ এগিয়ে এসে বলে, কোচে গিয়ে বসেন। হাজারে হাজার মানুষ যাচ্ছে। কারো কিছু হইলেই তো আপনারা ব্রেকিং নিউজ দিয়া ফেসবুকে আমগো গালাগালি করবেন।

সোমা বলে, আমরা বাচ্চাশিশু না; আমাদের নিয়ে আপনার এতো ভাবতে হবে না।

চা-দোকানী আরেক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে বলে, নেন আপা খান। মেজাজ ঠান্ডা করেন; আপনারে তো আবার ভাবী বললে আপনি বিরক্ত হন।

কোচ কিছুটা চলতে চলতে গিয়ে জ্যামে পড়ে। একেবারে বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জ্যাম। বশির তীব্র হতাশায় ঘুমিয়ে পড়ে। শোনে কানের কাছে কেউ বলছে,

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন ।

হঠাত সামনের নববিবাহিত তরুণীর কর্কশ কন্ঠে বশিরের ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে তার স্বামীকে বলছে, হয়তো একদিন তুমিও এরকম স্বার্থপর হয়ে যাবা। মেয়েটা এতোবার ডাকলো তবু লোকটা ঘুম থেকে উঠলো না। অভিমান করে মেয়েটা নাটোরে নেমে গেলো।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.