আমীন আল রশীদ : বাংলা একাডেমি বিবিধ পরিবর্তন এনে কিছু বানান আমূল পাল্টে দিয়েছে। প্রমিত/শুদ্ধ বানান দেখার জন্য তাদের সবশেষ বানান অভিধানটি যদি আপনি খোলেন, তাহলে বিভ্রান্ত হবেন। যদিও বাংলা একাডেমি লিখেছে, ইদ শব্দটি ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচিলত বানান। আর ঈদ শব্দটি ইদ-এর প্রচলিত ও অসংগত বানান। বাংলা একাডেমি বলেনি যে, এখন থেকে ‘ইদ’ লিখতে হবে। তারা শুধু নিয়মটা বলেছে এবং ‘ঈদ’ বানানটিই যে প্রচলিত, সেটিও বলেছে। এখানে সমস্যার কোনো কারণ দেখি না। অনেক প্রচলিত ভুলই আমরা করে থাকি প্রতিনিয়ত। যেমন ‘অপর্যাপ্ত’ শব্দের অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। কিন্তু আমরা শব্দটি ব্যবহার করি প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থে।

বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুযায়ী সকল বিদেশি শব্দের বানান হ্রস্ব-ই কার দিয়ে লিখতে হবে। যেমন আমরা এখন লিখি স্পিকার, স্পিড, গ্রিস ইত্যাদি। কিন্তু শ্রীলংকা ঠিকই দীর্ঘ ‘ঈ’ কার দিয়ে। কেউ কেউ ফেসবুকে নিজের বিদেশি নামের বানান উল্লেখ করে লিখেছেন, এখন বাংলা একাডেমি কি আমার নামও বদলে দেবে? অবশ্যই না। এই এখতিয়ার বাংলা একাডেমি কেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানেরই নেই। ব্যক্তির নামের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাকরণ প্রযোজ্য নয়। যেমন আমার নামের তিনটি শব্দই (আমীন আল রশীদ) আরবি। আমি লিখি দীর্ঘ ‘ঈ’ কার দিয়ে। বাংলা একাডেমির কি সাধ্য আছে যে আমার নামটি আমিন আল রশিদ করবে? বাংলা একাডেমি সে কথা বলেও না।

মনে রাখা দরকার, বাংলা একাডেমিই রাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যাদেরকে বানান রীতি ঠিক করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। আমি হয়তো বাংলা ভাষা নিয়ে অল্পবিস্তর পড়ালেখা করে নিজেকে পণ্ডিত ভাবতে পারি, কিন্তু এও ঠিক যে, বাংলা একাডেমির বানান নির্ধারণ কমিটিতে যারা রয়েছেন, তারা আমার চেয়ে বেশি পণ্ডিত। বেশি পণ্ডিত বলেই তারা কমিটিতে আছেন। আমি নেই।

পাশাপাশি এও ঠিক, বাংলা একাডেমি বানান সংস্কার বা হালনাগাদ করার নামে বেশ কিছু জায়গায় বিভ্রান্তিও তৈরি করেছে। একই বিষয়ে তারা একটি নির্দেশনা দিয়ে, নিচে পাদটিকায় ব্যতিক্রম উল্লেখ করে কিছু শব্দ জুড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ এই নিয়মের বানান হবে এই, কিন্তু ব্যতিক্রম হলো এই। এই ব্যতিক্রমগুলোই ঝামেলা পাকায়। কিন্তু বাংলা একাডেমি এই ঝামেলা মেটাতে পারছে না।

বাংলা একাডেমি যদি দীর্ঘ ‘ঈ’ কার, দীর্ঘ ‘উ’ কার উঠিয়ে দেয়,তিনটি শয়ের (শ, ষ, স) বদলে একটি শ, দুটি ন-এর (ণ, ন) বদলে একটি ন লিখতে বলে তাহলে শত শত বছর ধরে বাংলা ভাষায় যেসব সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর কী পরিণতি হবে? স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা থেকে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ উঠিয়ে দেয়া হবে নাকি তাদের ব্যবহৃত বানানগুলো হালনাগাদ করে নতুন করে পাঠ্যবই ছাপানো হবে? যদি তা না হয়,তাহলে ক্ল্যাসিক সাহিত্যে একজন শিক্ষার্থী একরকম বানান দেখে যখন আধুনিক সাহিত্যে ভিন্নতা দেখবেন, সেটি কি তাকে বিভ্রান্ত করবে না? পরীক্ষায় খাতায় সে কী লিখবে, ‘ঈদ’ না ‘ইদ’?

বলা হয়, ভাষা হচ্ছে প্রবহমান নদীর মতো। আমাদের বর্ণমালায় একসময় ‘লি’ ও ‘ডাবল লি’ নামে দুটি বর্ণ ছিল। অপ্রয়োজনীয় বলে সে দুটি বাদ দেয়া হয়েছে। এখন তিনটি স, দুটি ন, দীর্ঘ ঈ কার, দীর্ঘ ঊ কার থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। যেমন পাখী, শাড়ী, বাড়ী এরইমধ্যে পাখি, শাড়ি, বাড়ি হয়ে গেছে। সুতরাং ‘ঈদ’ যদি ‘ইদ’ হয় তাতে ক্ষতি কী?

সাপ্তাহিক যায়যায়দিন এবং পরে শফিক রেহমান যখন এটিকে দৈনিকে রূপান্তরিত করলেন (আমিও ওই টিমের একজন সদস্য ছিলাম) সেখানে অনেক ইংরেজি শব্দের বানান (যেমন কৃকেট) যেমন যায়যায়দিন তার নিজস্ব স্টাইলে লিখত, তেমনি অনেক শব্দের সুন্দর বাংলা থাকার পরও ইংরেজি ব্যবহার করত (যেমন অ্যাডভাইজর)। এসব নিয়ে শফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমরা অনেক তর্ক করেছি।
প্রথম আলোও অনেক শব্দ তার নিজস্ব স্টাইলে লেখে যেটি বাংলা একাডেমির সাথে মেলে না। ফলে এ বিষয়েও একটা সমাধানে আসা দরকার যে, কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলেই তার নিজের মতো করে বানান লিখতে পারে কি না? যদি পারে তাহলে বাংলা একাডেমি থাকার কোনো প্রয়োজন আছে কি না? কারণ আজ যায়যায়দিন ও প্রথম আলো নিজস্ব ভাষারীতি তৈরি করবে, তো কাল সমকাল ও কালের কণ্ঠও এটা করবে। এভাবে সব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব রীতিতে লিখবে এবং ভাষার ক্ষেত্রে একটা ভয়াবহ নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। বাংলা ছাড়া আর কোনো ভাষায় এরকম চর্চা আছে কি না আমার জানা নেই।

লেখক : সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.