‘ঈদ’ নাকি ‘ইদ’: বিভ্রান্তি দূর হোক
0.0Overall Score
Reader Rating: (0 Votes)

টি.এম. রকিব হাসান : গত কয়েক বছরে বাংলা ভাষা ও বাংলা বানান নিয়ে যে ক্রমাগত উল্লম্ফন চলছে, তাতে আশাহত হওয়ার বহুবিধ কারণ রয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ভুল বাংলা বানানের যে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে, তাতে করে আমাদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যেকোন বানানে বাংলা লিখলে চলে। এভাবে চলতে থাকলে শুদ্ধ বাংলা বানান রীতি হুমকির মুখে পড়বে; এটা নিশ্চিত।

দেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকা যখন ‘ঐ’ এর জায়গায় ‘ওই’ লেখে তখন সবাই চুপ থাকেন! বাংলা একাডেমিও চুপ থাকে!! আর কোন জাতীয় পত্রিকা যখন যত্রতত্র চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করে; তখনও সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। যেমন- তাঁর। কাউকে সম্মান দিলে আমরা ‘তার’ শব্দের উপর চন্দ্রবিন্দু দিয়ে ‘তাঁর’ লিখি। কিন্তু যখন চোর, বাটপার, ছিনতাইকারী, ইভটিজার, ধর্ষনকারীর নামের সাথে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়; তখন সবাইকে এক কাতারে এনে মূলত সম্মানিতদের অসম্মান করা হয়।অথচ কাউকে এর প্রতিবাদ করতে দেখি না।

ঐ পত্রিকার দেখাদেখি অন্যান্য গণমাধ্যমও যখন সেই ভুলটা অনুসরণ করে; তখনও বাংলা একাডেমি কোন প্রতিবাদতো দূরের কথা একটা বিবৃতি দিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার প্রয়োজন বোধ করে না!! দেশে একেক মিডিয়া হাউস একেক বানানরীতি অনুসরণ করে; এটাকে হাউস স্টাইল বলা হয়! তাহলে বাংলা একাডেমির বানানরীতির প্রয়োজন কী? কেন বাংলা ভাষা এবং বানান নিয়ে এত জগাখিঁচুড়ি অবস্থা ? এত বছরেও কেন বানানের একটা সুনির্দিষ্ট মানদন্ড তৈরি হলনা ? এসব বিষয়ে বাংলা একাডেমির কোন জবাব নেই! হুট করে ঈদের আগে ‘ঈদ’হবে না ‘ইদ’ হবে বলে একটা বির্তক তৈরি করা হলো।

এ বিষয়ে বাংলা ভাষাবিদ ও লেখক ড. হায়াৎ মাহমুদ গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাংলা শব্দে তো বহু বিদেশি শব্দ রয়েছে। নিজেদের শব্দ তো হাতেগোনা। ফলে সবই কি পরিবর্তন হবে? যে শব্দ যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সেটা পরিবর্তন করার কোনও কারণই দেখি না। এতে মানুষ ‘কনফিউজড’ হয়। যেহেতু কোনও ভুল নেই, সেহেতু পরিবর্তনেরও তো কোনও দরকার নেই। ‘ঈদ’ শব্দে ‘ই’ এর পরিবর্তে ‘ঈ’ ব্যবহারই সুন্দর।’’

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘ই’ ও ‘ঈ-এর মধ্যে উচ্চারণগত পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। ‘ঈদ’ যেহেতু আরবি শব্দ, ফলে এর উচ্চারণটা আরবি ব্যাকরণসম্মত। তাই প্রচলিত শব্দে ‘ঈ’বাদ দিয়ে ‘ই’ লিখতে গেলে বিদঘুটে লাগবে।

লেখক ও চিন্তাবিদ সাখাওয়াত টিপুর মতে, ‘মূলত ‘ঈদ’ শব্দে প্রথম ‘ঈ’ ব্যবহার করেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলা ছাড়াও আরবি-ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। ফলে তিনি যেসব আরবি-ফারসি শব্দকে বাংলা ভাষায় ব্যবহার করেছিলেন, তা জেনেবুঝেই করেছিলেন। যেমন— ‘ঈ’-এর উচ্চারণ আসে গলার ভেতর থেকে। কিন্তু‘ই’-এর ক্ষেত্রে সেটা হয় না। বাংলা একাডেমি বানানে সংস্কার করতে এত কিছু হিসাব না করে কেবলই জবরদস্তি করা শুরু করেছে।’

এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘বিদেশি শব্দ লিখতে ‘ঈ বা ‘ঈ-কার নয়, ‘ই বা ‘ই-কার লেখার নিয়ম। সে হিসেবেই বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই ‘ঈদ’কে ‘ইদ’ও লেখা যাবে। এই পরিবর্তনে এত মাতামাতি করার কিছু নেই। তবে আমার মনে হচ্ছে, জামায়াত অথবা কোনও উগ্রবাদী মতাদর্শের লোকজনের বিষয়টি নিয়ে বেশ মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে।’

লেখক ও ভাষাবিদ হায়াত মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক এবং সাখাওয়াত টিপুর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ঈদ লিখতে ‘ই’ নয় ‘ঈ’ হবে যুক্তিযুক্ত। এরপরও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক যদি বিষয়টিতে রাজনৈতিক রং দিয়ে এটাকে উগ্রবাদী মতাদর্শের লোকজনের মাথাব্যাথার কারণ বলে এড়িয়ে যেতে চান; তখন বলিতে হয় –‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’।(ছোটগল্প-জীবিত ও মৃত)

ঈ’ এবং ‘ই’ নিয়ে এতসব বিতর্কের পর এখন কোন সচেতন নাগরিক যদি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে প্রশ্ন করেন; স্বাধীনতার এতবছর পরও ‘বাংলা একাডেমি’ নামের পাশে ইংরেজি ‘একাডেমি’ শব্দটা কেন রয়ে গেল? ‘একাডেমি’ শব্দের কোন বাংলা প্রতিশব্দ এতদিনেও কেন খুঁজে পেলেন না? তাহলে আশা করি এ প্রশ্নের মধ্যে তিনি কোন রাজনৈতিক গন্ধ না খুঁজে যথাযথ উত্তর দেবার চেষ্টা করবেন।

বি.দ্র: কলকাতায় ‘একাডেমি’ শব্দের পরিবর্তে ‘আকাদেমি’ শব্দ ব্যবহার করছে। আমাদের যেহেতু যুতসই শব্দ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাই আমার মতে ‘বাংলা একাডেমি’র পরিবর্তে ‘বাংলা সংরক্ষণাগার’ লেখা হোক।

লেখক : সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.