প্রকাশ বিকাশ ও আমি
4.2Overall Score
Reader Rating: (1 Vote)

মেহেবুব আলম বর্ণ : আমি অনেকদিনই প্রকাশ, বিকাশের কথা লিখতে চেয়েছি। আমার টাইমলাইনে অনলি-মি করে রেখে দিই অবশেষে। এ গল্পে ধর্ম চলে আসে। এ গল্পে রাজনীতি প্রকৃতই মূখ্য। এই দুই বিষয় চরম বিব্রতও করে। তাই গল্প পেড়ে কিছুদূর এগিয়ে থমকে দাঁড়াই। কষ্টগুলো নিতে না পেরে ক্লান্ত ঘুমে ডুবি। ধর্ম ও রাজনীতি মানুষ নিপিড়নের হাতিয়ারও ! তা না হলে প্রকাশ,বিকাশ কেন ভারতে? আমি কেন বাংলাদেশে?

প্রকাশ বিকাশ দুইভাই। বিকাশ বড়। প্রকাশ আমার সমবয়সি, এক আড্ডার, তাস খেলার বন্ধু। বিকাশদা ও আমি রাজশাহী ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র। বিকাশ দা আমার চেয়ে দুই বছরের বড় এসএসসি ১৯৮২ ব্যাচ। হেলেনাবাদ কলোনীতে থাকতো ওরা। তাদের বাবা রাজশাহী সরকারি কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এইচএসসির পর হেলেনাবাদ কলোনী মোড়ের আড্ডায় আমাদের ও বিকাশ দার ব্যাচ একাকার হয়ে যায়। বিকাশকে দাদা ডাকলেও তিনিও প্রকাশের মতোই ঘনিষ্ট।

১৯৯০ এর শুরু দিকে সকাল সন্ধ্যা জমজমাট আড্ডা হতো কলোনীর মোড়ে। হঠাৎ একদিন আড্ডায় প্রকাশ নেই। একদিন দুদিন করে সপ্তাহ পেরিয়ে গেলো। প্রকাশ আড্ডায় আসেনা। বিকাশ দা কে জিজ্ঞাসা করি তিনি বলেন, প্রকাশ গ্রামের বাড়ি গেছে। মাস পেরিয়ে যায় প্রকাশ তবু আসেনা। সে তো গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এতো দিন থাকে না! আমাদের কাছে বলতো, আড্ডা ছেড়ে অন্য কোথাও গেলে দুইদিন পরে আর ভালোলাগেনা। সে কী করে দুই মাস ধরে গ্রামে আছে ! বিকাশ দা বলেন, প্রকাশ জ্বরে পড়েছে, তাকে জমিজমা দেখতে হচ্ছে, চলে আসবে। কিন্তু প্রকাশ আসেনা। তখন তো মোবাইল ফোন ছিলো না আমাদের। তাই আমরা অপেক্ষা করি তার। মাস তিনেক পর একদিন জানা গেলো প্রকাশ ভারত চলে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় আছে সে।

বিকাশ দা পড়তেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভালো ফলাফল করেছিলেন তিনি। পড়া শেষে বেসরকারি সংস্থা ব্রাকে কয়েক বছর চাকুরি করেছেন। তারপর চাকুরি ছেড়ে মুরগি ও গরু লালন পালনের খামার গড়েন। এরমধ্যে বিয়েও সেরে ফেলেছেন, বাবা হয়েছেন। বিকাশ দা-ও বন্ধুদের কাউকে কিছু না জানিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে একদিন চলে গেলেন মালদহে।

আমাদের একাধিক বন্ধু ভারত গিয়ে প্রকাশ, বিকাশের সঙ্গে দেখা করে এসেছে। রাজশাহীতে বিকাশ দার প্রিয় বন্ধু ছিলেন মামুনভাই। তাঁর কাছেই শুনেছি, প্রকাশ ভারত গিয়ে শুরুতে হোটেল শ্রমিকের কাজ করেছে। বিকাশ দা যাবার পর দুইভাই মিলে ছোট্ট একটি দোকান চালায়। তাদের জীবনমান নিম্নমুখি। বিকাশ দা চরম হতাশ। তার মেয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু সেখানে ভালো বিয়ে দিতে পারছেন না। বাংলাদেশে তাদের যে অবস্থান ছিলো সেটা নেই সেখানে। বিকাশ দা জীবনের এমন অবস্থার জন্য তার বাবাকেই দায়ী করেন। তার ইচ্ছে ছিলোনা ভারতে চলে যাবার। বাবার পিড়াপিড়িতে তাকে চলে যেতে হয়েছে। তার বাবা অবসর নেবার পর রাজশাহী থেকে তাদের গ্রামের বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জ চলে গেছেন। প্রতিমাসে অবসর ভাতা নেবার জন্য তিনি থেকে গেছেন। প্রকাশ, বিকাশের একমাত্র বোনের বিয়ে হয়েছে বাংলাদেশে। তার স্বামী সরকারি চাকুরি করেন। ফলে তারাও মালদহ যাবেনা। মা, বাবা, বোনসহ অনেক স্বজন বাংলাদেশে। আর তারা দুইভাই ভারতে। তাই এখনো সেখানে মন বাসাতে পারেনি।

রাজশাহী হেলেনাবাদ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সুশীল স্যারও থাকতেন হেলেনাবাদ কলোনীতে। স্যারের একছেলেকে স্কুল জীবনেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ভারতে। অবসর জীবনের পর স্যার চলে গেছেন কি না জানিনা। তবে স্যারের এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে বাংলাদেশেই। ফলে এ পরিবারটিও দুই দেশে বিভক্ত। আমার এক বন্ধুর বোন কলেজ জীবনে প্রেমে পড়ে এক হিন্দু ছেলের। পরিবার, ধর্ম ছেড়ে বোনটি তাকে বিয়েও করে। তাদের সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে। আমাদের সেই বোনের শ্বশুর পরিবার অনেক চেষ্টা করেছে সবাই মিলে ভারত চলে যাবার। কিন্তু বোনটি যেতে চাইনি, যায়নি। কিন্তু সে তার মেয়েকে ধরে রাখতে পারেনি। জামাইবাবু তার মেয়েকে ভারতে বিয়ে দিয়েছেন। জোর চেষ্টা চলেছে ছেলেটিকেও ভারতে পাঠানোর। কিন্তু আমাদের ভাগ্নে তার মাকে ছেড়ে যাবে না। তারা মা ছেলে বাংলাদেশে থাকার পক্ষেই লড়াই করে যাচ্ছে। এ নিয়ে পরিবারটিতে প্রায়ই অশান্তি দেখা দেয়।

এই যে তিনটি হিন্দু পরিবারের জন্মভূমির প্রতি অনাস্থা, অবিশ্বাস তার জন্য কি তারা দায়ী? রাজশাহীতে এই তিনটি পরিবার কখনো মুসলমানদের দ্বারা অন্যায়, অবিচার, আক্রমনের শিকার হয়েছে তাও নয়। এখানে তাদের যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান ছিলো তা ভারতে পাওয়া যাবে না জেনেও তারা নিজ জন্মভূমির উপর কেন আস্থা হারালেন? আমাদের সমাজ জীবনে যারা সাধারণ মানুষ যাদের আমরা আমজনতা বলি তারা কি কখনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টে নেতৃত্ব দিয়েছে? কোন সাধারণ মানুষ হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করেছে ? আমার এসব প্রশ্নের উত্তরের সাথে চলে আসে রাজনীতি। রাজনীতির শিকারেই প্রকাশ, বিকাশ আজ ভারতে। বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া কোন হিন্দু বন্ধু যখন প্রশ্ন করে, ”বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘুদের জন্য কতটা নিরাপত্তা দিতে পেরেছে? কেন প্রতিবেশি দেশে চলে আসতে হচ্ছে?” তখন এর উত্তর গলার কাছেই দলা পেকে আঁটকে থাকে। মুখ হয় লজ্জায় বিব্রত।

আমার দাদার বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় মুর্শিদাবাদ থেকে প্রচুর মুসলিম পরিবার বাংলাদেশের রাজশাহীতে চলে আসে। আমার দাদারা দুই ভাই ছিলেন। তারা ভারত ছাড়েননি। আমার পুরো বংশটিই রয়ে গেছে সেখানেই। আমার দাদির পরিবারের অনেকেই চলে এসেছেন রাজশাহীতে। তারা বারবার করে আমার দাদাকেও চলে আসতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু দাদা অনড় তাঁর জন্মভুমি ছাড়েননি। আমার আব্বারা ৯ ভাই এক বোন। আব্বা সবার বড় । তখন ভারতে লেখাপড়া করে মুসলিম পরিবারের সন্তানদের চাকুরি পাওয়া কঠিন ছিলো। এই যুক্তিতে অবশেষে দাদা আমার বাবাকে রাজশাহীতে লেখাপড়া করতে পাঠিয়েছিলেন। আব্বার পরে আমার এক চাচাও এসেছেন বাংলাদেশে উন্নত জীবনের আশায়। বাকী ৭ চাচা ও ফুপু এখনো মুর্শিদাবাদেই আছেন। আমার ৯ বছর বয়সে আব্বা মারা গেলেন। আর আমি যেন বাংলাদেশে একা হয়ে গেলাম।

অামার মার পরিবারও মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছে। আমার জন্মভূমি বাংলাদেশে মামা খালারা আছেন তবুও নিজ বংশের জন্য আমার তো এখনো মন কাঁদে। ছেলেবেলায় ভারত বাংলাদেশের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মা পাড়ি দিয়েই চলে যেতাম দাদা দাদির বাড়ি। যত দিন গেছে ততই দূরত্ব বেড়ে গেছে রাজশাহী থেকে মুর্শিদাবাদের। পদ্মা এখনো সেখানেই আছে। পদ্মায় ঘাটগুলো আর নেই তেমন। এখন পদ্মা পেরলেই কাঁটাতারের বেড়া। এখন কোন আত্মীয় মরলেও ছুটে যাওয়া যায়না। অথচ ১৯৭৬ সালে আমার আব্বা মারা যাওয়ার দিনেও দেখেছি মুর্শিদাবাদ থেকে আমাদের গ্রামের অনেক মানুষ এসেছিলেন জানাজায় । যারা অপরাধি, চোরাকারবারি, জঙ্গি তারা কোন না কোনভাবে ঠিকই সীমান্ত পার হয়ে যায়। কাঁটাতারের বেড়া তাদের কি আটকাতে পারে? আমি অামার দাদা দাদিকে মাটি দিতে পারিনি। পাশপোর্ট, ভিসা প্রক্রিয়া শেষ করে তো তা সম্ভব হয়না। কিন্তু যোগাযোগ, সম্পর্ক তো এমন ছিলো না। এই যে আমাদের বিচ্ছিন্নতা এজন্য কি আমি দায়ী ? ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ এই রাজনীতি কি আমার, বিকাশ বা প্রকাশের? দেশ ভাগের পরেও আজো আক্রান্ত কেন আমরা ? এ বিষের ক্ষয় নেই শুধুই জয় দেখি ভারতেও বাংলাদেশেও।

লেখক : সাংবাদিক (লেখাটি ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.