আনন্দ কুটুম : খেলায় ‘বিনোদন’ বলতে আপনি কী বুঝেন? শুধু হার-জিতের রেজাল্ট? নাকি পুরো বিষয়টি উপভোগ করা? আসুন আমি কী বুঝি সেটা বলি।

ধরুন আপনি আজ ভারতের সমর্থক ছিলেন। স্বভাবতই আশা করেছেন ট্রফি ভারতের ঘরে উঠবে। খেলা দেখা শুরু করেছেন সেই বিশ্বাস থেকে। ভারত যখন বোলিং এ গেলো তখন আপনার মাঝে টানটান উত্তেজনা। কিছুক্ষণ পর দেখা দেলো ভারত খুব বাজে বোলিং করছে আর আপনি ঘামছেন। অপর দিকে পাকিস্তান সমর্থকদের উল্লাস। তার কিছুক্ষণ পরে দেখা গেলো টপাটপ পাকিস্তানের উইকেট পড়ছে। আপনি এবার বেজায় খুশি। উলটো অবস্তা পাকিস্তানের।

এই যে পুরোটা সময় আপনি আশা করেছেন নিজের দল জিতবে। কিন্তু জেতেনি। এই যে আপনি আশা করতে করতে আশার চূড়ায় উঠে গেলেন এবং সেখান থেকে আশাহত হয়ে পড়ে গেলেন। এই আশা এবং আশাভঙ্গের যাতনাই হল বিনোদন।

আপনি দেখছেন ভিরাট বল আকাশে তুলে দিয়েছে। প্রথম সেকেন্ডে মনে হল, আরেব্বা এটা তো ছয়। ২য় সেকেন্ডে মন হল, না এটা চার। ৩য় সেকেন্ডে দেখা গেলো বলের নিচে পাকিস্তানি একজন প্লেয়ার দাঁড়িয়ে। আপনার আত্মা কেপে উঠলো। একবার মন বলছে ক্যাচ হবে। অন্যবার মন বলছে ক্যাচ হবে না। আপনি নিজের স্বপক্ষে বিশ্বাস স্থাপন করলেন, না ক্যাচ হবেই না। কিন্তু ততক্ষণে আপনার হার্টবিট বাড়ছে। অবশেষে সব জল্পনাকল্পনা শেষে ভিরাট আউট!!! সবাই সমস্বরে চিৎকার, আউট!!! এটাই বিনোদন।

খেলার শুরুতে রেজাল্ট জেনে যাওয়াটা বিনোদন নয়। এটা হল নিশ্চিত সান্তনা পুরস্কার। যার কোন ক্রেডিট নেই। খেলা মানেই জুয়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর সিদ্ধান্ত। এর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

আবার ধরুন, সারাদুনিয়ায় পাকিস্তানের কোন সাপোর্টারস নেই। মাত্র ১১ জন খেলোয়াড় ছাড়া। আর দুনিয়ার ৭০০ কোটি মানুষ ভারতের সাপোর্টারস। তাতেও কিন্তু বিনোদন হবে না। বিনোদনের জন্য পক্ষ বিপক্ষ খুব জরুরী অন্তত এই বিশেষ খেলায়।

এই যে পুরো সময়টা জুড়ে আমি আশা করেছি, চিৎকার করেছি, বিশ্বাস করেছি, আশাভঙ্গ হয়েছে, বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে, ঘেমেছি, হার্টবিট বেড়েছে, হয়ত কেঁদেছি, কষ্ট পেয়েছি, হেসেছি, অন্যকে হাসিয়েছি। এগুলোই তো বিনোদন। তাই না??
আমি আশা করেছি এবং আমার আশা পুরন হবে আমি নিশ্চিত ছিলাম এবং পুরন হয়েছে। এটা তো আর বিনোদন নয়। দোদুল্যমানতাই এখানে বিনোদন।

রোজ আমি আপনিই কিন্তু বলছি যে, খেলা আর বিনোদন থাকছে না; খেলা রাজনীতি হয়ে গেছে; খেলা জাতিবিদ্বেষ ছড়াচ্ছে; খেলা মানুষকে হিংস্র করে দিচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন আমার প্রশ্ন হল, আপনি কি এই জাতিবিদ্বেষ, রাজনীতি, হিংসার অংশ হবেন? নাকি অন্তত নিজের অবস্থান থেকে বিনোদিত হয়ে খেলার আসল উদ্দেশ্যের অংশ হবেন। খেলার কাজ বিনোদন দেওয়া। হানাহানি নয়।

আমার নিজের দল জিতুক বা হারুক আমি আসলে খেলার আনন্দ টুকুই নিতে চাই। আর কিছু না। এই যে খেলা দেখতে দেখতে চিৎকার করি, টেনশনে ঘামি, খেলা নিয়ে ফেবুতে তর্ক বিতর্ক করি, প্রার্থনা করি পাকিস্তান হেরে যাক, কিন্তু আমার সব আশা ভরসা মিথ্যা করে দিয়ে পাকিস্তান জিতে যায়, এই সব কিছুই আমার নিকট আনন্দ। যে’ই জিতুক না কেন তাকে দ্যর্থকন্ঠে শুভেচ্ছা জানানোতেই আমার আনন্দ।

অস্বীকার করছি না যে, খেলা আজ যে পর্যায় চলে গেছে সেখান থেকে সরল ভাবে চিন্তা করার সুযোগ কম। স্বীকার করছি খেলা আজ রাজনীতির নামান্তর। কিন্তু আমি দৃঢ় চিত্তে স্বীকার করতে চাই যে, আমি সচেতন ভাবে এই রাজনীতির এবং জাতিবিদ্বেষ এর অংশ হতে চাই না। আমি নাচ দেখে, গান শুনে, ম্যাজিক দেখে যেভাবে বিনোদিত হই। ঠিক সেভাবেই খেলা দেখেও বিনোদিত হতে চাই।

তোমরা আমার সাথে একমত না হও ক্ষতি নেই। আমার গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে খেলা না দেখো ক্ষতি নেই। আমার গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আমি একাই সাম্যের গান গাইব।খেলায় হেরে গিয়েও চিৎকার করে বলব,

“সালার দেখলি তো, দারুণ খেল দেখালো কিন্তু ওরা মাইরি। জিও পাকিস্তান। ফির মিলেঙ্গে। জরুর মিলেঙ্গে!!”
লেখক : চলচ্চিত্র কর্মী (লেখাটি ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.