খেলাতে রাজনীতি

 খেলাতে রাজনীতি

মেহেবুব আলম বর্ণ : খেলাতে রাজনীতি। এ বিষয়ে বিতর্ক পুরনো। ৮০ দশকে আমাদের পাড়ায় আমি আর লেবুভাই ছিলাম ভারত ক্রিকেট দলের সমর্থক। পাড়ার আর সবাই পাকিস্তান দলের সমর্থক। আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে পাকিস্তানকে ঘৃণা করতাম। অন্যরা বলতো খেলায় রাজনীতি টানা ঠিক না। কমিউনিস্ট পার্টি কিংবা আওয়ামী লীগের অনেক কর্মীও খেলার সময় পাকিস্তানের জন্য চরম হা হুতাশ করতো। তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও কথা বলতো। কিন্তু শত যুক্তি, বিতর্কেও তাদের শেষ কথা খেলায় রাজনীতি বাদ। গলাবাজিতে আড্ডায় শেষ পর্যন্ত আমরা দুজন পেরে উঠতাম না। এমনসব গরম তর্কে কোন কোন প্রতিবেশি বন্ধু মুসলমান মুসলমান ভাইভাই প্রসঙ্গও টানতো। এখন ভারত, পাকিস্তান,বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা এলে আমি আমার পাড়ার সেইসব দিন, কথা, তর্ক, রাগারাগি,দেখতে পাই ফেসবুকে। তখনকার মতো এখনো ভারত বিশেষ খেলার দিনে পাকিস্তানের কাছে হেরে সমর্থকদের মুখ বন্ধ করে দেয়। তবে এই ফেসবুকের বদৌলতেই দিন বদলেছে এখন পাকিস্তানকে ঘৃণা করার তারুন্যের সংখ্যা কম নয়।

আমাদের পাড়ায় ক্রিকেট খেলার গল্প শুরু হলে ‘ জাদেজা’ ব্যাটের কথা আসেই। টেনিস বল দিয়ে খেলার জন্য ভারতীয় ক্রিকেটার অজয় জাদেজার নামে ব্যাটটি আমি তৈরি করেছিলাম। সেই ব্যাট বিভিন্ন মাঠে খেলতে যেত। বাড়িতে সচিন , সৌরভের পোস্টার সাটিয়েছিলাম। আবাহনী কিংবা ভারতের খেলা থাকলে মা বলতেন, বাবা খেলা শুরু হবার আগে খেয়ে নে, তাছাড়া হেরে গেলে তো আর খাবিনা, তোর চোখ মুখ দেখা যাবে না তখন। ভারত- পাকিস্তানের খেলায় আমরা বড্ড পাগল হয়ে থাকতাম ! বেশ মনে আছে বাংলাদেশ যেবার পাকিস্তানকে প্রথম হারালো সেদিন বেশিরভাগ পাকিস্তান সমর্থকদের মন খারাপ ছিলো ভারতের সমর্থকরা জ্বালাবে ভেবে। সেদিন সবচেয়ে বেশি খুশি ছিলো ভারতের সমর্থকরা। নিজের দেশ জিতেছে বলে খুশি হয়েছিলো কিশোর ও শিশুরা। সেই থেকে বাংলাদেশের জেতা শুরু হলো আর কমতে থাকলো ভারত আর পাকিস্তান দলের কট্টর সমর্থন।

এখন তো পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের খেলা হলে ঐ প্রেস্টিজ ইস্যুটা নেই। ভারত পাকিস্তানের ম্যাচের দিন যাদের সমর্থন পাকিস্তানের পক্ষে তীব্রতর হয় তারাও বাংলাদেশের সঙ্গে খেলার দিন দেশপ্রেমেই আবিস্ট থাকেন। আর ভারতের সাথে খেলা এলে তো চরম আকার নিচ্ছে। এমন মারমুখি মনোভাব ৮০ দশকে দেখিনি। ভারতের প্রতি তখনও এতো বিদ্বেষ মনোভাব ছিলো না। এটা দিনে দিনে বাড়ছে। এটাই স্বাভাবিক। ভারতের প্রতি রাগ বেড়েছে বলে পাকিস্তানের প্রেমে হাবুডুবে চলছে তাও নয়। খেলার মাঝে তারুণ্যেও রাজনীতি দেখেছি এখন মাঝ বয়সেও তা-ই দেখি। হ্যা, রাজনীতির কারণেই বাংলাদেশে ভারতের প্রতি বিদ্বেষ উপরমুখি। ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত বেশি নাক গলাবে এটা ততই বাড়বে, কমবে না। কারণ ভারত বন্ধু হিসেবে কেমন তা মানুষ জানে, বোঝে।

ক্রিকেটেও ভারতের আচরণে বেশিরভাগ বাংলাদেশি ভক্ত বিরক্ত, রাগান্বিত তা তো বিদ্বেশেই প্রমানিত। ভারতীয় ক্রিকেট নিজেদের কেবলি উচু জাতের ভাবেই না তারা জাত বিভাজনও করতে চেয়েছে। বাংলাদেশকে তারা হেয় করে শান্তি পায়। এসব দেখে দেখে বাংলাদেশ শক্তি সঞ্চয়ের পর এখন পাল্টা জবাব দিচ্ছে। বাংলাদেশের এমন ক্ষোভের আগুনে প্রতিনিয়ত ঘি ঢালে ভারতীয় খেলোয়াড়রা। ফলে হিংসা, জ্বালা বাড়ছেই। কহোলীর জ্বিহার জ্বালা মেটাতে পাকিস্তানি আমিরের জ্বিহায় অনেক বাংলাদেশীর প্রশান্তি জুটে যায় খেলারই মাঠে। এ সুখে কেউ হাততালি দেয়, আওয়াজ করে ওঠে। কেউ চুপচুপ সুখটুকু একাকি উপভোগ করে। পাকিস্তানের যে কোন পরাজয় অনেক অনেক বাংলাদেশীকে যেমন পরম সুখ দেয় তেমন ভারতের যে কোন পরাজয়েও এমন সুখি হওয়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

অথচ ৭০ বছর অাগেও তিনটি দেশ একটি ছিলো। রাজনীতিই ঠাই ঠাই করেছে। রাজনীতিই তিনটি দেশকে ভালো প্রতিবেশি হতে দিচ্ছে না। এর দায় কার ? ভারত পাকিস্তানেরর খেলায় যে বাংলাদেশি পাকিস্তানের জয়ে উল্লাস করেছে তার? বাংলাদেশি যে সমর্থক এখন ভারতকে প্রভুর আসনে দেখে তার? বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনে ভারত ও পাকিস্তানের ভূমিকা নীরবে যাদের দেখতে হয় তাদের? বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের যে রাজনীতি তা অনুভব করে এখন ভারতের সাথে যে কোন দেশের খেলায় ভারত বিরোধীতা বাংলাদেশের মাটিতেও জেগে ওঠায় স্বাভাবিক। পাকিস্তানের দেয়া মুক্তিযুদ্ধের আঘাত বাংলাদেশে সব সময়ই দগদগে ঘা। এ জ্বালা আছেই। তবে পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে। পাকিস্তানের রাজনীতি পারাজিত বাংলাদেশের কাছে। পাকিস্তান থেকে ঘটেছে মুক্তি।

কিন্তু ভারত স্বাধীন বাংলাদেশকে তো বেঁধে ফেলেছে। ভারত বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারেনি। বাংলাদেশে সত্যিকার গণতন্ত্র চর্চার জন্য তো ভারতের বড়ভাই সুলভ আচরণ থেকে মুক্তি দরকার। কিন্তু তা তো বর্তমান রাজনীতিতে মিলছে না। তাই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া আপাতত আর কিছু করার নেই। এই ক্ষোভ মেটানোর কোন খেলার মাঠে যদি বাংলাদেশের কাছে রাজনীতিতে হেরে যাওয়া, চরম শত্রু পাকিস্তানও ভারতকে পদানত করে দেয় তাও এখন খারাপ লাগছে না অনেক অনেক বাংলাদেশির।

চরম সাম্প্রদায়িক দলের নেতা নরেন্দ্র মোদির মতো খুনি যখন ধর্ম নিরপেক্ষ ( তথাকথিত ) ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন তখন আমার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত লাগে। ভারতে ধর্মীয় রাজনীতির বিকাশে ভয় পাই এর বিষ ছড়ানোর। তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়েই বুঝি, পাকিস্তান তো হেরেই গেছে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতির ফল তারা নিজেরা নিজেরা বোমা ফুটিয়ে উদযাপন করছে। পাকিস্তানের আর সুযোগ নেই আমাকে শাসন ও শোষনের। কিন্তু অামার সীমান্তের সুযোগ নিয়ে ভারত তো আমাকে শাসনে ভূমিকা রাখছে শোষন সচল রাখতে। একদিকে আমার দেশের ক্রিকেটের জেগে ওঠা আর অন্যদিকে ভারতের আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে এখন আর ভারত দলের হেরে যাওয়ায় আমার মন খারাপ হয়না। পাকিস্তানের কাছে হেরে গেলো তবুও না। জানিনা লেবুভাই এখন দেশে থাকলে কি বলতেন।
লেখক : সাংবাদিক (লেখাটি ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.