চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও হাওর অঞ্চলের বন্যায় ফসল ক্ষতির অজুহাতে বাড়ছে চালের দাম। মাসের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা চালের দাম ১০০-৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আর খুচরা বাজারে কেজিতে বেড়েছে ১৫-১৭ টাকা। বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ জনসাধারণের। আর দাম বাড়ার জন্য মিল মালিকদের দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা।

চাক্তাই ও পাহাড়তলী পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের দাম মানভেদে ১০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আজকের বাজারে স্বর্ণ সিদ্ধ প্রতি বস্তা ২ হাজার ৩৫০ টাকা; মিনিকেট আতপ ২ হাজার ৪৫০ টাকা; কাটারীভোগ ২ হাজার ৬৮০ টাকা; বেতি আতব ২ হাজার ৩৫০ টাকা; ইরি বাউস মোটা ১ হাজার ৭৫০ টাকা; মিনিকেট সিদ্ধ ২ হাজার ৪৫০ টাকা; জিরা চাল ২ হাজার ৬৩০ টাকা; চিনি গুড়া চাল মানভেদে ৩ হাজার ৬০ টাকা থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রিয় হচ্ছে।

পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে চালের দাম ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। উত্তরবঙ্গে মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কাছে চালের বাজার জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা চালের দাম বাড়ানো-কমানো আমাদের হাতে নেই। মিল মালিকদের নির্ধারিত দামেই বিক্রি করতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁ, দিনাজপুর, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সান্তাহার (বগুড়া), রাজশাহী, কৃষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলায় ৩০০ এর বেশি চাল মিল ব্যবসায়ী আছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন বড় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট ধান ও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

চট্টগ্রামের বড় পাইকারি বাজার পাহাড়তলী ও চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ীরা জানান, নওগাঁ, মহাদেবপুর, আশুগঞ্জ, দিনাজপুর, পাবনা, ঈশ্বরদীর মোকামগুলো থেকে চট্টগ্রামের বাজারগুলোতে চাল আসে। আশুগঞ্জ থেকে বেতি ও ইরি, দিনাজপুর থেকে মিনিকেট, পাইজাম, চিনিগুড়া, কাটারিভোগ জাতের আতপ এবং নওগাঁ, পাবনা ও ঈশ্বরদী থেকে সিদ্ধ চাল কিনতে হয়। ওই এলাকাগুলো থেকে গড়ে প্রতিদিন ৪৭৫ টন চাল চাক্তাইয়ের আড়তে আসে। পাহাড়তলী পাইকারি বাজারে আসে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ টন চাল। ৫০ কেজির প্রতি বস্তায় ১৫-২২ টাকা কমিশন পান আড়তদাররা।

দেশে ধান উৎপাদন বাড়ানোর পর সরকার চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি (শুল্ক) এবং ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) নির্ধারিত রয়েছে। চাল আমদানিতে ৩০ শতাংশ শুল্ক গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। এই অজুহাতে ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনামুল হক বলেন, ভারত থেকে প্রচুর চাল আমদানি হয়। সম্প্রতি চালে আমদানি শুল্ক বাড়ায় স্থল বন্দর দিয়ে চাল আমদানি কমেছে। আমদানি না থাকা এবং হাওরাঞ্চলে ফসলহানির কারণে মিল মালিক ও কৃষকরা চাল বেচাকেনা করছেন না। শুল্ক কমিয়ে এখনই আমদানির সুযোগ না দিলে চালের মূল্য আরও বাড়বে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, হাওর অঞ্চলে বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির কারণে চালের দাম বাড়ছে। সরকারিভাবে ৬-৭ লাখ টন ফসল ক্ষতির কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে। আর বন্যার কারণে উত্তরবঙ্গের চাল বিক্রেতারা সংকটের অজুহাতে চালের বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে। চাল আমদানির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল সরকার; ওই চাল আমদানির আগ পর্যন্ত চালের দাম হয়তো কমবে না।

অন্যদিকে ভোক্তারা বলছেন, সুষ্ঠু বাজার মনিটরিং না থাকার কারণেই নানা অযুহাতে চালের দাম বেড়ে চলেছে। বাজার মনিটরিং হলে অবশ্যই চালের দাম জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, মনিটরিং টিম সব সময় বাজারে আছে। এক বাজারে তদারকি করলে অন্য বাজারে দাম বাড়াচ্ছে। চালসহ সব ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা সচেষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.