খায়রুল আনাম : 

( ১ ) কয়েকদিন আগে সৌদি আরব সহ প্রতিবেশি গাল্‌ফের পাঁচটি দেশ তাদের আর এক ক্ষুদ্র প্রতিবেশি দেশ কাতারকে হঠাৎ করে চারদিক থেকে ব্লক করায় সারা পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছে। আর এতে সবচেয়ে চমকে গেছে ও চরমভাবে উদবিগ্ন হয়েছে বিশ্বের মুসলিম সমাজ। এতদিন অনভিপ্রেত হলেও তারা দেখে এসেছে শিয়া সুন্নীর মধ্যে গন্ডগোল। এখন থেকে কি সেটা খোদ সুন্নীদের মধ্যেই ঢুকে গেল? নিজেরাই নিজেদেরকে শেষ করবে? ইংরেজীতে যাকে বলে “বিগিনিং অফ দি এন্ড?” এর শেষ কোথায়?

এর মধ্যে আবার কিছু কিছু মজার ঘটনারও উল্লেখ করা যায়। যেমন ইয়েমেন, কাতারের সাথে বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। আহারে, বেচারা কাতার! সে দেশের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি-র তো ভয়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে যাবার অবস্থা ! সাপ্রতিক কালের যুদ্ধে যখন মিনিটে মিনিটে বজ্রপাতের মতো বোমা পড়ে ইয়েমেনের সব কিছু চুরমার হয়ে গিয়েছিল, তার ফলে ইয়েমেনের ওড়ার মতো একটা বিমানও কি অবশিষ্ঠ আছে? তবে সে কি নিয়ে কাতারের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিল?

চুটকে মালদ্বীপও কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গেছে। কারণ তারা সৌদিদের কাছে বিশেষ ভাবে ঋণী। সৌদি আরব মালদ্বীপকে পাঁচ বছর মেয়াদী ৩০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এক সৌদি প্রপার্টি কোম্পানি মালদ্বীপে একটি ফেমিলি রিসর্ট বানানোর জন্য ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । সৌদি ইসলামিক স্কলাররা ১০০,০০০ ডলার খরচ করে মালদ্বীপে ১০ টি ওয়ার্ল্ড ক্লাস মসজিদ বানানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

অভাবনীয় এই বিশাল সংকটের শুরু হয়েছে কিন্তু খুবই নগণ্য একটা ব্যাপার নিয়ে। বলা হচ্ছে, কাতারের আমিরের কিছু মন্তব্য নাকি কাতার নিউজ এজেন্সি, আল জাজিরা থেকে হ্যাকিং করা হয়েছে। আমির নাকি আরব রাজ্যগুলির নেতাদের অদুরদর্শিতা সম্পর্কে কিছু অশোভন উক্তি করেন এবং দুঃখজনক হলেও, কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলেন। তিনি আরবদের ইরানের সঙ্গে এক ধরণের সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। কাতার অবশ্য এই গল্পের সত্যতা পুরোপুরি অস্বীকার করে। কিন্তু সৌদিরা সিদ্ধান্ত নেয় যে এটা সত্য এবং তাদের নিজস্ব গুরুগম্ভীর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্কে খবরটি প্রচার করা শূরু করে। তারা কাতারের আমিরের ঐ ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের জন্য উপযুক্ত শাস্তি পাওয়া উচিত বলে মনে করে।

কিন্তু এ বিষয় নিয়ে সমস্ত সুন্নি মুসলিম দেশকে একত্র করার কিছু সমস্যা হচ্ছে। কুয়েত সম্পর্ক ছিন্ন না করে কাতার এবং সৌদি আরব ও অন্যান্য আমিরাতিদের মধ্যে একটা মিটমাট করে দেবার জন্য শান্তিদূত হিসেবে কাজ করছে। দুবাইয়ের ইরানের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ইরানের হাজার হাজার প্রবাসী “এক্সপ্যাট” হিসেবে সে দেশে রয়েছে। দুবাই আবুধাবির ক্রোধের উদাহরণটি ঠিক অনুসরণ করতে চাচ্ছে না। আবার মাত্র কয়েক মাস আগে ওমান, ইরানের সাথে যৌথভাবে নৌবাহিনীর মহড়া দিয়েছিল। আর পাকিস্তান, ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদিদের সাহায্য করার জন্য আগেই তাদের সেনাবাহিনী পাঠাতে অস্বীকার করেছিল। গুজব ছিলো, সৌদিরা নাকি শিয়া সৈন্যদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সুন্নি সৈন্য পাঠাবার জন্য অনুরোধ করেছিল।

সবশেষে, মিশরের রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাতাহ আল-সিসি, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন করার জন্য কাতারের বিরুদ্ধে তর্জন গর্জন করছে। ব্রাদারহুড এখন সেখানে নিষিদ্ধ। কিন্তু আল-সিসি অধুনালুপ্ত সেই ব্রাদারহুডকে আই এস-এর একটা অংশ বলে মনে করে। যেটা উল্লেখযোগ্য তা হলো, যদিও মিশর সৌদি আরবের কাছ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পায়, তবুও ইয়েমেনের সঙ্গে সর্বনেশে যুদ্ধে যেতে সৌদিদের জন্য সৈন্য সরবরাহ করার পরিকল্পনা তাদের নেই। বরং তারা ইসরাইলের পাশাপাশি নিজের দেশে আইসিস-এর বিরুদ্ধে এবং প্যালেস্টাইনের গাজা স্ট্রিপ অবরোধের জন্য মিশরীয় সব সৈন্যদের ঘরে রাখা বেশি প্রয়োজন মনে করছে।
( ২ )
সৌদিদের উদ্বেগের আসল কারণটি বুঝতে একটু চেষ্টা করা যাকঃ
ক) কাতার আসাদ প্রশাসনের সঙ্গে লো লেভেলের এক ধরনের যোগাযোগ বহাল রেখে চলে। কাতার জাব্‌হাত আল-নুসরার হাত থেকে সিরিয়ার খৃস্টান নান্‌দের মুক্তির ব্যাপারে সাহায্য করেছে এবং পশ্চিম সিরিয়ায় আইএস বাহিনীর কাছ থেকে লেবাননের সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারেও সাহায্য করেছে। যখন নান্‌রা বন্দী অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তারা বাশার আল-আসাদ ও কাতার উভয়কেই ধন্যবাদ দিয়েছিল।
খ) গাল্‌ফ অঞ্চলের দেশগুলির ক্রমবর্ধমান সন্দেহ এই যে, যুদ্ধ পরবর্তী সিরিয়ার পুনর্নির্মাণের জন্য কাতারের অনেক বড় উচ্চাকাংখা রয়েছে। আসাদের অবর্তমানে, এমনকি আসাদ যদি রাষ্ট্রপতির পদে বহাল থেকেও যায়, তাহলেও সিরিয়া সরকার কাতারি অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে আসবে। এবং তাতে করে এই ক্ষুদ্র কাতার দুটি গোল্ডেন রিওয়ার্ড বা স্বর্ণ পুরস্কার পেয়ে যাবেঃ
• এটি আল জাজিরা যেমন মিডিয়া এম্পায়ার বানিয়েছে, তার সাথে ম্যাচ হয়ে সিরিয়ার মতো একটি ল্যান্ড এম্পায়ারও পেয়ে যাবে ।
• এতে করে কাতার তার মূলধন সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলগুলিতে ব্যপক ভাবে প্রসারিত করতে পারবে। অনেক তেল কোম্পানি পারস্য উপসাগর থেকে তুরস্কের মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ান পাইপ লাইন রুট হিসাবে ব্যবহার করবে। বিকল্প হিসেবে সিরিয়ার বন্দর লাত্তাকিয়া থেকে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমেও তেল চালান করবে। এর ফলে জাহাজগুলিকে আর হরমুজ প্রণালীর (স্ট্রেট অফ হরমুজ) মধ্য দিয়ে যেতে হবে না বলে সমুদ্রগামী তেলের রুটগুলিও কম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে।

(৩ )

কিন্তু এহ বাহ্য। ধোঁওয়ার আচ্ছাদন বা স্মোকস্ক্রিন সরিয়ে আগুনের আসল উৎসের সন্ধানে চলে যাওয়া যাকঃ

প্রকৃতপক্ষে গন্ডগোলের আসল উৎস হলো প্রাকৃতিক (ন্যাচারাল) গ্যাস – তরলিত ন্যাচারাল গ্যাস বা এল এন জি (LNG)। সিরিয়াতে যে এতদিন ধরে প্রক্সি ওয়ার চলছে, হাজার হাজার মানুষ মরছে, বিল্ডিংগুলো ধুলিসাৎ হচ্ছে, গৃহহারা অসহায় মানুষগুলো রেফ্যুজি হয়ে আশেপাশের দেশে ও ইউরোপে লাথি ঝাঁটা খেয়ে বেড়াচ্ছে তার কারণ আদৌ শিয়া সুন্নীর গন্ডগোল বা একনায়কত্ব বনাম গণতন্ত্র নয়। জাস্ট দুই প্রতিদ্বন্দী পাইপ লাইন কোম্পানীর রেসারেসি। আগেই বলা হয়েছে কাতার চায় তার যে বিশাল গ্যাস রিজার্ভ আছে , সেটা নিজের পাইপ লাইন মানে ট্র্যান্স-সিরিয়ান পাইপ লাইনের ( Trans-Syrian Pipe Line) মাধ্যমে তুরস্কের মধ্য দিয়ে ইউরোপে সাপ্লাই দিতে। মুস্কিল হলো, তাতে রাশিয়ান গ্যাস কোম্পানী “গ্যাসপ্রম” (Gazprom) এর ইউরোপে এল এন জি সাপ্লাই করার যে একছত্র আধিপত্য আছে , সেটা ব্যহত হবে। রাশিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গ্যাস সাপ্লায়ার (38.7%)। তারা “উরেনগয়-পোমারি-উঝগোরদ” (Urengoy-Pomary-Uzhgorod) নামে একটা পাইপ লাইন ব্যবহার করে। সেজন্য রাশিয়া প্রথম থেকেই অত্যন্ত দৃঢ়তা এবং অনেক ক্ষেত্রে হিংস্রতার সঙ্গে ট্র্যান্স-সিরিয়ান- পাইপ লাইনের বিরোধিতা করে আসছে। পুতিন যে আসাদ রেজিমকে বলিষ্ঠভাবে সাপোর্ট করে এবং ক্রেমলিন যে সিরিয়ান গভর্নমেন্টকে অপসারণের পুরোপুরি বিরোধিতা করে আসছে, এটাই তার ব্যাখ্যা।

সৌদি আরব যে কাতারের আমিরের সমালোচনায় অপমানিত বোধ করে তাকে শাস্তি দেবার জন্য বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, তাদের সেই অফিসিয়াল ভার্সানটা “ব্লুমবার্গ নিউজ” অ্যানালিস্টদের কাছেও ঠিক মনে হয়নি। বরং গ্যাস নিয়ে দ্বন্দটাই তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। ব্যাপারটা শুরু হয়েছে সেই ১৯৯৫ সাল থেকে, যখন কাতার তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ন্যাচারাল গ্যাস রিজার্ভ, “অফশোর নর্থ ফিল্ড” থেকে গ্যাসের প্রথম শিপমেন্ট পাঠানো শুরু করে। মজার বিষয় হলো এই গ্যাসফিল্ডটা কাতারের একার নয়। তারা এটা ইরানের সঙ্গে শেয়ার করে। আর ইরান হলো সৌদি আরবের ঘৃণ্য জন্মশ্ত্রু। কিন্তু অনিবার্য্য কারণে কাতার ইরানকে চটাতে পারে না। যাই হোক, এই হিউজ গ্যাস রিজার্ভের ফলে, সৌদিদের যেমন তেল নিয়ে একাধিপত্য বা মনোপলি, কাতারেরও গ্যাস নিয়ে সেই একই রকমের মনোপলি। সৌদির তেলের উইন্ডফল প্রফিটের মতোই গ্যাস নিয়ে কাতারেরও লাভে লাভে ছয়লাপ। তাছাড়া সৌদি আরব ও অন্যন্য তেল উৎপাদনকারি দেশকে যেমন ওপেক (OPEC) জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়, গ্যাস উৎপাদনের ব্যাপারে কাতারের তেমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

এই সম্পদ কাতারকে শুধু যে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী জাতিতে পরিণত করেছে তাই নয়, এখন তাদের মাথাপিছু আয় (পার-ক্যাপিটা ইনকাম) দাঁড়িয়েছে ১৩০,০০০ হাজার ডলার। গত দুই যুগ ধরে রপ্তানী করতে করতে কাতার এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ এল এন জি রপ্তানিকারক দেশ। প্রতিদ্বন্দী কেবল রাশিয়ান কোম্পানী, গ্যাসপ্রম। অর্থের বলে বলীয়ান হয়ে কাতার আস্তে আস্তে সৌদি আরবের কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিরপেক্ষ ভাবে তার নিজের পলিসি ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। প্রথম দিকে সে সিরিয়ান রেবেলদের পেছনে টাকা ঢেলেছে, যাতে বাশার আল আসাদকে হঠানো যায় ও তার ট্র্যান্স-সিরিয়ান পাইপ লাইনটা বানানো সম্ভব হয়। এই খাতে তারা গত দু’বছরে ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে, যেটা পৃথিবীর সব সরকারের অনুদানের চেয়ে বেশি ছিল। এখন অবশ্য ঐ বিদ্রোহীদের জন্য সৌদি টাকার পরিমাণ সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু কাতারের বিদ্রোহীদের ঐ অর্থনৈতিক সাপোর্ট, সিরিয়ানদের জন্য গৃহযুদ্ধ অর্থাৎ সিভিল ওয়ার ডেকে এনেছে, যাতে এমনকি পশ্চিমাদেরও অত হাত ছিল না।

কঠিন সত্যটা হলো, যতই দিন গিয়েছে, কাতার উপলব্ধি করেছে যে, রাশিয়া কোন ক্রমেই সিরিয়ার ভেতর দিয়ে তাদের পাইপ লাইন নিয়ে যেতে দেবে না। তখন সে বাধ্য হয়ে তার কৌশলের মোড় ঘুরিয়ে রাশিয়ার দিকে ফোকাস করে। তার ফলশ্রুতিতে “কাতার সভারেন ওয়েলথ ফান্ড” রাশিয়ান সরকার চালিত “রস্‌নেফ্‌ট অয়েল (Rosneft Oil)” তেল কোম্পানীতে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে, এবং তা করে যদিও ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি, ইউ এস সেন্টাল কম্যান্ড, কাতারেই অবস্থিত। এর ফলে একটা ভয় এসে যাওয়া স্বাভাবিক যে কাতার ক্রমশ সিরিয়া-ইরান-রাশিয়া ব্লকের দিকে ঢলে পড়ছে। তাই সৌদি সমেত কাতারের প্রতিবেশীরা তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বলা যায় আস্পর্ধা লক্ষ্য করে দিনে দিনে সন্ত্রস্থ ও সহিষ্ণু হয়ে পড়ছিল। কি করে তার ডানাটা কেটে, ওড়া বন্ধ করে অনেকটা থামানো যায়, তার সুযোগ খুঁজছিল। এবং একটা বিশেষ ক্ষণে সে সুযোগটা এসে যায়।

যাই হোক, গ্যাসের ব্যাপারটায় আবার ফিরে যাওয়া যাক। কাতার এমনিতেই সৌদি আরব সহ গালফ প্রতিবেশীদের গ্যাস সাপ্লাই দিয়ে থাকে। প্রতিবেশি স্টেট গুলোর দ্রুত উন্নতি হবার ফলে তাদের ইলেকট্রিক পাওয়ারের চাহিদা আরো বেড়ে যায়। সেটা মেটাতে তাদের বাইরে থেকে গ্যাস আমদানী করতে বা নিজেদের দেশে গ্যাস উত্তোলন করতে অনেক বেশি খরচ হয়। অন্যদিকে কাতারের গ্যাস তুলতে পৃথিবীর সবচেয়ে কম অর্থ খরচ হয়। প্রতিবেশিরা কাতারের গ্যাস চায়, কিন্তু ডিসকাউন্ট প্রাইসে। তাই কম পয়সায় কাতার তাদের এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে নারাজ। তারা বরং উল্টোপথ ধরে। ২০০৫ সালে কাতার নর্থফিল্ড থেকে আরো অধিক পরিমাণে গ্যাস তোলার প্রোগ্রাম ২ বছরের জন্য স্থগিত রাখে (মরেটোরিয়াম) এই বলে যে, তাদের কিছু এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে হবে গ্যাসের কোয়ালিটি কেমন আসে ও তুলতে খরচ কেমন পড়ে। প্রতিবেশিদের বাড়তি গ্যাসের চাহিদা এখান থেকে মেটাবার কথা। কিন্তু এই স্থগিত রাখার অন্তর্নিহিত কারণটা ছিল অন্য, যেটা কাতার ভয়ে প্রকাশ করতে পারেনি। তা হলো, ঐ ফিল্ড শেয়ারকারী ইরান, কাতারের মতো অত তাড়াতাড়ি, অত বেশি গ্যাস তুলছিল না। সেই দু’বছরের মরেটোরিয়াম ঘোচাতে একযুগ কেটে গেল। মাত্র এ বছরর গত এপ্রিলে, ইরানের গ্যাস তোলার রেট, কাতারের রেটের সমকক্ষ হয়েছে।

এখন ঐ অঞ্চলের মানুষ মাথা চুলকাচ্ছে যে, সৌদি কাতারের কাছে কি চায়? অনেকে বলছে সৌদি চায় কাতার তাদের কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করুক। সেটা করা কাতারের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ তারা ইসলামিক ব্রাদারহুডকে একটা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে মনে করে না, কারণ তারা প্রকৃতপক্ষে তা নয়। তারা ইরানের সংগেও সম্পর্ক কাট-অফ করতে পারে না। কারণ গ্যাস না থাকলে তাদের সমস্ত উন্নতিই একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। একমাত্র গ্যাসই কাতারকে সত্যিকারের এভাবে একঘরে করার কারণ কিনা তা সৌদি ও ইরান উভয়েই বিবেচনা করবে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর – সবাই কাতারের গ্যাসের উপর প্রচন্ডভাবে নির্ভরশীল। সংযুক্ত আরব আমিরাত দৈনিক ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন কিউবিক ফিট কাতারি গ্যাস ব্যবহার করে, যেটা ডলফিন পাইপলাইন দিয়ে আসে। এবং কাতারের সঙ্গে তাদের ২ বছর মেয়াদী এল এন জি সাপ্লাইয়ের কনট্রাক্টও আছে। কাজেই এটা “টিট ফর ট্যাট” হয়ে দাঁড়াবে কি না সেটা দেখার বিষয়। কাতারি বৈদেশিক মন্ত্রি বলেছেন যে, এই ব্লকেডে কারুরই লাভ হবে না, “ইফ উই লুজ ওয়ান ডলার, ইউ উইল অলসো লুজ ওয়ান ডলার।”

কাতারের নিজের খাদ্য, দুগ্ধ ও খাবার পানীয় বলতে গেলে নেই। সবই আমদানী করতে হয়। এতদিন পাশের দেশগুলো থেকে, প্রধানত সৌদি আরব থেকে সে সাপ্লাইগুলো আসতো। সব কিছু বন্ধ করে দেবার ফলে এখন সাপ্লাইগুলো অন্যান্য দেশ থেকে, প্রধানত তুরস্ক ও ইরান থেকে আসা শুরু হয়েছে। রাশিয়া, পশ্চিমা দেশগুলো, তুরস্ক, ইরান সমেত অন্যান্য অনেক দেশ ব্যাপারটার একটা মিমাংসা করে ফেলার জন্য দু’পক্ষকে আহবান জানিয়েছে। অনেকের মনে হচ্ছে, নিজের নাক কেটে, পরের যাত্রা ভঙ্গ করাটা ঠিক হচ্ছে তো ? ভুল করে একটা অত সমৃদ্ধশালী দেশকে ইরান-সিরিয়া-রাশিয়ার গালে তুলে দেওয়া হয়ে যাচ্ছে না তো ? মুসলিম বিশ্বের নেতাদের উপর পৃথিবীর জনসাধারণের ও সাধারণ মুসলিম জনসাধারণের যতটুকে আস্থা অবশিষ্ঠ আছে, তাতে ভাঁটা পড়বে না তো ? ব্যাপারটা গভীরভাবে ভাববার বিষয়।

( ৪ )
কাতার সুন্দরীর প্রেমে না পড়ে উপায় আছে? দেওয়া হলো এক নজরে কাতারের অবস্থানঃ

১) বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু বার্ষিক আয়, পার ক্যাপিটা ইনকাম ১৪৬ হাজার ডলার (আগের ফিগারটা ছিল অন্য সূত্রের)
২) মিলিওনেয়ারদের সংখ্যা ৩০ হাজার – পৃথিবীতে দ্বিতীয় দেশ।
৩) শিক্ষার কোয়ালিটির দিক থেকে আরবদের মধ্যে প্রথম স্থান। পৃথিবীতে চতুর্থ – জাপানের পরেই।
৪) স্বাস্থ্যের গুণমানের দিক থেকে আরবদের মধ্যে প্রথম, বিশ্বে ছয় নম্বর।
৫) দুর্নীতি দমনে আরব দেশের মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বে ২০ তম স্থান।
৬) নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের দিক থেকে নিরাপদ স্থান হিসেবে পৃথিবীতে দ্বিতীয়।
৭) গ্লোবাল কম্পিটেটিভ কান্ট্রি-র রিপোর্ট অনুযায়ী আরবে প্রথম ও বিশ্বে ১২ নম্বর।
৮ ) বেকারত্ব নির্মুলের দিক থেকে পৃথিবীতে প্রথম।
৯) কাতারি ব্যাংকের অ্যাসেট ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন কাতারি রিয়াল।
১০) কাতারের ব্যাংক আরববিশ্বে বৃহত্তম, অ্যাসেটের পরিমাণ প্রায় ৫২০ বিলিয়ন রিয়াল ।
১১) ক্যাপিট্যাল ডেভেলপমেন্টের দিক থেকে আরবদের মধ্যে প্রথম।
১২) কাতারের “সভারেন ফরেন ফান্ড” ৩৯ টি দেশ জুড়ে বিস্তৃত, তহবিল ৩০০ বিলিয়ন ডলার।
১৩) ইউরোপের বৃহত্তম ব্যাংক বার্কলেস এবং ক্রেডিট সুইসে তাদের উল্লেখযোগ্য পরিমান শেয়ার।
১৪) বিশ্বের বৃহত্তম লাকসারী ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, লন্ডনের সবচেয়ে আভিজাত হ্যারড্‌স (Harrods) এর মালিকানা। ।
১৫) বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকল্পে বার্ষিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়।
১৬) কাতার এয়ারওয়েজ বিশ্বের দ্রুততম বর্ধিষ্ণু বিমানসংস্থা। বিমান সংখ্যা ১৭০ টি।
১৭) কাতার টেলিকম ১৭ টি দেশের মধ্যে বিস্তৃত, গ্রাহক সংখ্যা ১০৭ মিলিয়ন।
১৮) ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের টাওয়ারগুলির ২৮ % কাতার মালিকানাধীন।
১৯) বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে পানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় বিনামূল্যে।
২০) বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে কোন ট্যাক্স নেই।
২১) হামাদ বিমানবন্দর বিশ্বের সেরা এয়ারপোর্ট হিসেবে শিরোপা পেয়েছে।
২২) অপটিক্যাল ফাইবারের বিস্তারে বিশ্বের প্রথম দেশ।
২৩) বিশ্বের অবকাঠামো সূচক বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনডেক্স এর দিক থেকে এই দেশ প্রথম।
২৪) জাতীয় সঞ্চয়ের দিক থেকে দেশটি বিশ্বে প্রথম ।
২৫) ইন্টারনেটের গতির দিক থেকে আরব দেশের মধ্যে প্রথম ।
২৬) মানব উন্নয়নের দিক থেকে আরব দেশগুলোর মধ্যে প্রথম ।
২৭) বিশ্বের প্রথম এলপিজি ( লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস, LPG ) উত্পাদনকারী দেশ।
২৮) ১৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত আছে , যা দিয়ে ৪০ বছর চলে যাবে।
২৯) ৯০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত আছে, যা দিয়ে ১৪৩ বছর চলে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।
৩০) পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনে বিশ্বব্যাপী চতুর্থ স্থান।

আরবদের মধ্যে এটি একটি রাষ্ট্র যারা বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর বিশেষভাবে মনোযোগ দেয়।

লেখক : রাসায়নিক প্রকৌশলী, আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.