ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক নিয়ে অনেক পানি ঘোলা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্টজনদের মতামত ছাপা হয়েছে, সাধারণ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করেছে। সবাই ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্কের বর্ধিত অঙ্কের বিরুদ্ধে। সবার দাবি, সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র স্বার্থ বিবেচনা করে ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক আগের হারেই আরোপ করা হোক।

কিন্তু কেন জানি না, আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয় আপসহীন; তিনি কিছুতেই গোঁফ নামাবেন না (যদিও তাঁর গোঁফ নেই)।

নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা নিঃসন্দেহে একটি ভালো গুণ। আমাদের দেশে এমন গুণের অধিকারী মানুষ ক্রমেই বিরল হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের এই আপসহীন অবস্থানকে সাধুবাদ জানাতে পারলেই আমরা ধন্য হতাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা তা পারছি না। কারণ, প্রশ্নটি এখানে নীতির নয়, বৃহত্তর জনস্বার্থের।

কোটি আমানতকারী তাদের সামান্য সঞ্চয় ব্যাঙ্কে রেখে মুনাফা পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো মূলধনহানির শিকার হবেন, এমন কিছু কখনোই কাম্য হতে পারে না। এ কথা এতো দিন পত্রপত্রিকা বলেছে, ফেসবুকাররা বলেছে, এবার খোদ সংসদে সরকারদলীয় সদস্যের মুখেও তা শোনা গেলো।

সংসদে যারা আসেন তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই আসেন। সুতরাং সাধারণ মানুষের ভালো-মন্দ দেখা, তাদের চাওয়া-পাওয়া বিবেচনা করা তাঁদের পবিত্র দায়িত্ব। নিঃসন্দেহে সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে জেদ না ধরার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারদলীয় সাংসদ আবদুল মান্নান। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এ আহবান এবং মানুষের দাবি অনুযায়ী বর্ধিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

লক্ষ্য করার মতো হলো, মাননীয় সংসদসদস্য তাঁর বক্তৃতায় ”জেদ” শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অনুমান করাই যায়, প্রবল জনমতকে গুরুত্ব না-দেয়ায় সংসদসদস্য যে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন – এ শব্দটি তারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি ”ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে না” – অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে মন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ”এখানে জেদ ধরার বিষয় নেই। আওয়ামী লীগ মানুষের রাজনীতি করে। মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কাজ করছেন। মানুষ এ শুল্ক চায় না। আওয়ামী লীগ ভোটের রাজনীতি করে – এটা মাথায় রাখা প্রয়োজন।”

জনাব মান্নান বলেন, ”অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক আগেও ছিল। এবার তা বাড়ানো হয়েছে।’ কিন্তু আগে যে আবগারি শুল্ক ছিল, তা সহনীয় ছিল। মানুষ মনে করছে, বর্ধিত শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। এটি নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। অনেকে ব্যাংকে খোঁজ নিচ্ছেন আসলে কত রাখলে কত ফেরত পাওয়া যাবে। বর্ধিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করে এই সংশয় দূর করতে হবে।”

সংসদসদস্য সবচেয়ে দামি যে কথাটি বলেছেন তা হলো ”আওয়ামী লীগ মানুষের রাজনীতি করে। মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কাজ করছেন। মানুষ এ শুল্ক চায় না।”

অপ্রিয় হলেও সত্য, বিজ্ঞ অর্থমন্ত্রী মহোদয় আজ যে অবস্থানে আছেন তা তাঁর বিশাল অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার বলে, সাধারণ মানুষের পাশে থেকে; মাঠের রাজনীতি করে নয়। পক্ষান্তরে সংসদ সদস্যদের প্রয়োজন হয়েছে প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গণমানুষের সমর্থন। তাঁদের তাই বার বার মানুষের কাছে যেতে হয়, তাদের নাড়ির স্পন্দনটি অনুভব করতে হয়।

মাননীয় সংসদসদস্য মানুষের মনের কথাটিই তুলে ধরেছেন তাঁর বক্তৃতায় – ”আওয়ামী লীগ মানুষের রাজনীতি করে।… মানুষ এ শুল্ক চায় না।”

মানুষ যখন এ শুল্ক চায় না তখন মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে জেদ ধরা কি সরকার, সরকারি দল আওয়ামী লীগ কিংবা অর্থমন্ত্রী মহোদয় – কারো জন্যই মানানসই হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.