খন্দকার মুহিতুল ইসলাম : বাড়িটিতে কয়বার যে গেছি তার কোন হিসেব নাই। পেশাগত কারণে গেছি। আমার সম্পাদক সানাউল্লাহ নূরীও নানা সময় আমাকে সাথে নিতেন। দোতলা বাড়ির বিশাল ড্রয়িং রুমে বসতাম। ট্রলিতে নানা পদের খাবার আসতো। নিজেরাই তুলে নিতাম। মনে হয় সেদিন। কিন্তু না। অনেক দিন পার হয়ে গেছে।
বাড়ির ভিতর একটা সুইমিং পুল আছে। ব্যারিস্টার মওদুদের শখ তাতে সাঁতার কাটা। তার নিজের মুখেই শোনা। এরশাদ লং ড্রাইভে গেছিলেন শেখ হাসিনাকে নিয়ে–এমন এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন-মওদুদ তার লেখা এক বইতে। তখন তার টিকে থাকা দায়। আওয়ামী লীগ এবং এরশাদ ,উভয় পক্ষ ক্ষেপে গেছে তার উপর। মিটিং মিছিল প্রতিবাদ হচ্ছে। । আমি তার নির্জন বাড়িতে সেসময় ছুটে যাই। আমার সেদিন উপলদ্ধি হয়, মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লে বড় মাপের মানুষও কেমন নুইয়ে যায়। ড্রয়িংরুমে সেদিন তিনি আমাকে অনেক সময় দেন। উঠতে চাইলে বাধা দেন। জানতে চান, এখন কী করা উচিত। আমি যখন বললাম, তথ্য যদি ঠিক হয়, তাহলে চুপ করে থাকেন। তিনি এ কথার সাথে একাত্মতা জানিয়ে আমাকে ধন্যবাদ দেন।
ব্যারিষ্টার মওদুদ নি:সন্দেহে প্রতিভাবান মানুষ। বাংলাদেশে খুব কম রাজনীতিক অনেক পড়াশুনা করেন। লেখালেখি করেন। মওদুদ সেই কমদের একজন। তার লেখা বই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে জায়গা পেয়েছে।
মওদুদের মতো মেধাবি ও সে সাথে চতুর রাজনীতিক ক্ষমতায় থাকাকালে রাজউককে যদি বলতেন, বর্তমান বাড়িটি বৈধভাবে তাকে বরাদ্দ দেওয়া হোক– এ বাবদ রাজউককে তিনি টাকা পরিশোধ করবেন। আমার ধারণা, তার রাজউকে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। রাজউকের কর্মকর্তারা তার বাড়িতে এসে নতুন দলিল দিয়ে ধন্য বোধ করতেন। কিন্ত কথায় বলে, চোরের সাতদিন, সাধুর একদিন। পচা শামুকে পা কাটার মতো অসাবধানী মওদুদ নন। তারপরেও তিনি শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। এটাই মনে হয় নিয়তি।
আচ্ছা, মামলায় হেরে মওদুদ যদি স্বেচ্ছায় বাড়িটি ছেড়ে দিতেন, তাহলে তার সম্মান বাড়তো না কমতো? অন্যায়ভাবে তাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে ব্যারিস্টার মওদুদ যে যুক্তি দিচ্ছেন, তা কি ধোপে টিকছে? একটা লোক মৃত্যুর চারমাস পর দলিল সূত্রে বাড়িটি বিক্রি করেছে, মিথ্যা কাগজ তৈরির সময় তারিথটাও ঠিকমত দেখলেন না। হায় রে নিয়তি ! মনে রাখা দরকার–
২০১৭ সালের ৪ জুন বাড়ির মালিকানা নিয়ে রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
দুদকের দায়ের করা মামলার অভিযোগে অনুযায়ী, বাড়িটির মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মো. এহসান।
১৯৬০ সালে তৎকালীন ডিআইটির (রাজউক) কাছ থেকে এক বিঘা ১৩ কাঠার এ বাড়ির মালিকানা পান এহসান।
১৯৬৫ সালে বাড়ির মালিকানার কাগজপত্রে এহসানের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী অস্ট্রিয় নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্ত্রীসহ ঢাকা ত্যাগ করেন এহসান।
তাঁরা আর ফিরে না আসায় ১৯৭২ সালে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়।
এর পর ১৯৭৩ সালের ২ আগস্ট মওদুদ তাঁর ইংল্যান্ড প্রবাসী ভাই মনজুরের নামে একটি ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করে বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নেন বলে মামলায় অভিযোগ করে দুদক।
গত প্রায় তিন দশক ধরে এই বাড়িতে বসবাস করে আসছেন মওদুদ আহমদ। মামলায় হেরে যাওয়ার পর মওদুদ খুব ভালোভাবে জানতেন, এ বাড়িতে আর তার থাকা সম্ভব হবে না। আমার ধারণা, বেশীরভাগ মালপত্রও তিনি সরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে উত্তম হতো, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মামলায় হেরে যাওয়ার পরপরই যদি নিজে থেকে বাড়িটি ছেড়ে দিতেন।বাংলাদেশে যে সব আইনজীবী সর্বোচ্চ উপার্জন করেন, মওদুদ তার মধ্যে একজন।
এই বাড়ির আরেক স্মৃতি সরদার আমজাদ হোসেনের স্ত্রীর।সরদার আমজাদ নিজে বলেছিলেন আমাকে। খুব হেসেছিলাম সেদিন। ভেবেছিলাম, হায়রে টাকা! টাকা হলো এমন চিজ, খোদার সাথে উনিশ বিশ। সরদার আমজাদের শ্যালিকা মৃদুলাও আমার পরিচিত জন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। যাক সে কথা। প্রসঙ্গান্তরে নাই বা গেলাম। লিখলে কিন্তু ভাল বই দাঁড়িয়ে যায়।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.