ব্যাংকে জমায়ও করের বোঝা

 ব্যাংকে জমায়ও করের বোঝা

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকে জমা করা অর্থের ওপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি করায় জনমনে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। অনেকেই ব্যাংকে টাকা রাখার ব্যাপারে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররাও এ ব্যাপারে তাঁদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, এতে ব্যাংকে টাকা রাখার কিংবা মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে কালো টাকার পরিমাণ বেড়ে যাবে। এবার সেই ক্ষোভের প্রতিধ্বনি হলো সংসদ অধিবেশনেও। অনেক সংসদ সদস্য, এমনকি সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাঁরা নতুন করে আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

বাজেটে বরাবরই ব্যয়ের তুলনায় আয় কম থাকে। ফলে ঘাটতি বাজেট দিতে হয়। সরকার তখন আয় বাড়ানোর পথ খোঁজে। আর তার একটি সহজ উপায় হলো, ধরাবাঁধা যেসব করদাতা আছেন, তাঁদের ওপরই আরো করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক বাড়ানো তেমনি একটি সহজ উপায়। একজন চাকরিজীবী নিয়মিত আয়কর দেবেন। তার পরও ভবিষ্যৎ বিপদ-আপদের কথা চিন্তা করে অথবা প্রবীণ বয়সের সহায় হিসেবে অনেক কষ্টে ব্যাংকে কিছু টাকা জমানোর চেষ্টা করেন অনেকে। এখন সেই টাকায়ও বর্ধিত আবগারি শুল্ক দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, যাঁর হিসাবে এক লাখ টাকা থাকে তিনি নাকি সম্পদশালী। অথচ আয়কর প্রদানকারী চাকরিজীবীর চেয়ে ১০/২০ গুণ বেশি আয় করেন এমন অনেক ব্যবসায়ী, বাড়িওয়ালা বা বেতনবহির্ভূত উপার্জনকারী পেশাজীবী রয়েছেন, যাঁরা কোনো আয়করই দেন না। সরকার তাঁদের করের আওতায় না এনে যাঁরা কর দেন তাঁদের ওপরই নিত্যনতুন করের বোঝা চাপাচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, কর আহরণের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, অর্থাৎ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা-কর্মচারী, শুধু তাঁদের দুর্নীতি কমানো গেলে সরকারের রাজস্ব আয় অনেক বেড়ে যেত। অর্থনীতি সমিতি বিকল্প বাজেট প্রস্তাবে দেখিয়েছে, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করার মাধ্যমে আগামী অর্থবছরেই দ্বিগুণ অঙ্কের বাজেট দেওয়া যায়। রাজস্ব আয়ও দ্বিগুণ করা যায়। সরকার সে পথেও হাঁটছে না। কিন্তু একজন দরিদ্র বা আধাদরিদ্র মানুষ, যিনি খেয়ে না খেয়ে ভবিষ্যৎ বিপদ-আপদ মোকাবেলার জন্য ব্যাংকে এক লাখ টাকা বা সামান্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করেছেন, তাঁর সে সঞ্চয় কেড়ে নেওয়া কেন? উপার্জনহীন একজন বয়স্ক ব্যক্তির জমা থেকে এক টাকা কেটে নিলেও তা তাঁর মনঃকষ্টের কারণ হবে। বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলেরও যেসব সদস্য আবগারি শুল্ক আরোপের এই অযৌক্তিক প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন, আমরা মনে করি, একান্ত বিবেকের তাড়নায়ই তা করেছেন।

এমনিতেই প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় আন্তর্জাতিক হুন্ডি ব্যবসা ও চোরাকারবার ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। অনেক প্রবাসী শ্রমিক ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিবারকে যে অর্থ পাঠাবেন, তা ব্যাংকেই থাকবে। আবগারি শুল্কের ভয়ে তারা কি এখন হুন্ডিমুখী হবেন না! সরকারি কোষাগারের অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি অনেক কিছুই গিলে নিচ্ছে। সেগুলো বন্ধ করতে হবে। রাজস্ব আয় এমনিতেই বেড়ে যাবে। তা না করে শুধু সাধারণ মানুষের ঘাড়ে বোঝা চাপালে তার ফল ভালো না-ও হতে পারে। আমরা আশা করি, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত সহৃদয়ভাবে বিষয়টি বিবেচনা করবেন। সম্ভব হলে একটি যৌক্তিক সীমা পর্যন্ত সঞ্চয় আবগারি শুল্কের আওতামুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেবেন।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.