বিশেষ প্রতিনিধি : আপন জুয়েলার্সের শুল্ক ফাঁকি ও অবৈধ স্বর্ণ রাখার বিষয়টি সামনে আসার পরও স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা দাবি করলেন ‘দেশে বৈধ পথে কোনো স্বর্ণ আমদানি হয় না’। তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর)। ফলে প্রতি বছর দেশের চাহিদা পূরণ করা স্বর্ণের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিভিন্ন সময়ে চোরাচালানের মাধ্যমে আমদানি করা অনেক স্বর্ণ ধরা পড়ে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চোরাচালানের সময় প্রতি বছর যে স্বর্ণ ধরা পড়ে তা প্রকৃত চোরাচালানের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বেশিরভাগ স্বর্ণ ধরা পড়ে না। নানা উপায়ে নানা হাত ঘুরে চোরাচালানের স্বর্ণ চলে যায় ব্যবসায়ীদের হাতে।

তবে ব্যবাসায়ীদের দাবি, ভারতে স্বর্ণ নিতে বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। চোরাচালানের স্বর্ণ দেশের বাজারে থাকে না।

এদিকে চোরাচালানে আসা স্বর্ণের একটি অংশ যে দেশের বাজারে রয়ে যাচ্ছে- তার যথার্থই প্রমাণ পাওয়া গেছে, গত ১৪ মে আপন জুয়েলার্সের ৫টি শো-রুমে অভিযান চালানোর সময়। আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ বৈধ কাগজ দেখাতে না পারায় ওই শো-রুমগুলোতে থাকা সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণ এবং ৪২৯ গ্রাম হীরা জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর; সিলগালা হয় ওই শো-রুমগুলো।

এর ২১ দিন পর প্রাথমিকভাবে চোরাচালানের প্রমাণ পাওয়ায় গতকাল রোববার ৫টি শো-রুম থেকে ১৫.১৩ মণ স্বর্ণালঙ্কার, ১০ কোটি টাকার হীরা জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ঢাকা কাস্টমসের মাধ্যমে ওই স্বর্ণগুলো জমা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে।

মূলত বনানীর একটি হোটেলে ধর্ষণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আপন জুয়েলার্সের মালিকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ‘ডার্টি মানি’ ব্যবহারের অভিযোগ উঠে। এর সূত্র ধরে গত ১৪ মে আপন জুয়েলার্সের ৫টি শো-রুমে অভিযান চালায় এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

ভিন্ন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন আপন জুয়েলার্সে অভিযান চালানো হলো? বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি হচ্ছে না জেনেও স্বর্ণ ব্যবসায়ে জড়িত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেন অভিযান চালানো হচ্ছে না? এমন প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ স্বর্ণ উদ্ধারে দেশের সব স্বর্ণের দোকান এবং চোরাচালানে যুক্ত সব প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, চোরাচালান ও অবৈধ স্বর্ণের খোঁজে রুটিনমাফিক অভিযান করা উচিৎ।

তিনি আরো বলেন, শুধু আপন জুয়েলার্স স্বর্ণ চোরাচালান করে- তা কিন্তু নয়। দেশের অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। বিমানবন্দরে বিভিন্ন সময়ে বড়-ছোট স্বর্ণের চালান ধরা পড়লেও এর বহনকারী ছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্য কাউকে আটকের খবর পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে হবে। তারা কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে- তার সন্ধানও করতে হবে এনবিআরকে।

ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, স্বর্ণ চোরাচালান রোধে জনবল বাড়ানো উচিৎ। সব ধরনের শুল্ক ফাঁকি বন্ধে এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

আপন জুয়েলার্সে অভিযানের বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আপন জুয়েলার্সের ৫টি শো-রুমে অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বায়তুল মোকাররম মার্কেটে তাদের আরও দুইটি শাখা আছে। সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। তাই সেখানে অভিযানও হয়নি।

তিনি বলেন, আপন জুয়েলার্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছতার অভিযোগ ছিল। যাছাই-বাছাই শেষে ডার্টি মানি ব্যবহারের অভিযোগে অভিযান চালানো হয়েছে। অন্য কোনো জুয়েলারির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে সেখানেও অভিযান চালানো হবে।

আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যে ভ্যাট ও আয়কর দেয় এবং সর্বশেষ আয়কর বিবরণীতে যে স্বর্ণ মজুদের কথা বলা হয়েছে- তার সঙ্গে প্রাপ্ত স্বর্ণের মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ড. মইনুল খান।

তবে অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই দাবি করেছেন আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ। তিনি বলেন, আপন জুয়েলার্সে কোনো অবৈধ জিনিস (স্বর্ণ) নেই। আমাদের সব বৈধ জিনিস। আপন জুয়েলার্স ৪০ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠান। এখানে কোনো অবৈধ কিছু থাকতে পারে না।

এই স্বর্ণ ব্যবসায়ী বলেন, গত ৫ বছরে কোনো স্বর্ণ আমদানি করিনি। রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে স্বর্ণ তৈরি করা হয়েছে। সারাদেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসা করে। আমার দোকান বন্ধ হলে দেশের সব স্বর্ণের দোকান বন্ধ করা উচিৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.