আশীর্বাদের পুটলি

 আশীর্বাদের পুটলি
তাইমুর মাহমুদ শমীক :

পা দুটো না থাকার কারণে ঘর থেকে খুব একটা বের হইনা। আমার হুইল চেয়ারটা সুন্দর। আম্মা প্রতিদিন যত্ন করে মুছে দেয়। সন্ধ্যায় পাখিরা ঘরে ফিরে। মানুষ ঘরে ফিরে। আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ নই বলে ঘরের মানুষ ঘরেই থেকে যাই। অনেকেই বলে, তোমার কতো আরাম ! অখন্ড অবসর ! সারাদিন বই পড়বে, সিনেমা দেখবে। তোমায় আমরা হিংসে করি ! আমি তাদের কথা শুনে নীরবে হাসি। চোখের জল গোপন করে বলি, হ্যাঁ ভাই অনেক সুখে আছি আমি। আশীর্বাদের জীবন আমার !

একজন পূর্ণবয়স্ক অসমর্থ যুবককে স্নান করানো চারটিখানি কথা নয়। আমি জানি যতোদিন আম্মা বেঁচে আছে, গা ধোয়ানোর কাজ, খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার কাজ আম্মা করে যাবে হাসিমুখে। কিন্তু তারপর? মানুষটা তো অমরত্ব নিয়ে আর পৃথিবীতে আসেনি ! তাকেও চলে যেতে হবে একদিন। আম্মা কখনো মুখের উপর বলেনি, লুলা পুলাটা আমার জীবনের অর্ধেক আনন্দ মাটি কইরা দিসে। মরোস না কেন তুই অপদার্থর বাচ্চা ! যে পেটে ধরে সে জানে, সন্তান যেমনই হোক, তার সন্তানই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান।

আমার কি সেই প্রেমটা করতে ইচ্ছা করেনা? আমার কি বাবা হতে ইচ্ছা করেনা? আমার কি বইমেলায় যেতে ইচ্ছা করেনা? ইচ্ছা করেনা শাহবাগে গিয়ে বৈকালিক আড্ডা দিতে? কবিতা উৎসবে গায়ে পাঞ্জাবি চড়িয়ে হানা দিতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে? কিন্তু দিনশেষে ঘরেই বসে থাকি আমি। শীত আসে, শীত যায়। আমার জীবনে বসন্ত আসেনা। কিছু আউটসোর্সিং এর কাজ শিখে সামান্য কটা টাকা উপার্জন করি। গতমাসে বন্ধু অমলের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে আম্মার জন্য একটা নীল শাড়ি কিনিয়েছি। শাড়িটা বুকে জড়িয়ে আম্মার সেকি কান্না ! মনে হচ্ছিলো সকল হতাশা কাটিয়ে এই মানুষটার জন্য আমাকে হাসিমুখে বেঁচে থাকতে হবে।

তিথির সাথে বিয়ে হবার এক মাস আগে রোড এক্সিডেন্টে পা দুটো হারিয়েছিলাম। সেও প্রায় দুবছর হয়ে গেলো। প্রাইভেট কোম্পানি আমাকে আর রাখেনি। তাদের চাকরিতে দু’পাওয়ালা মানুষ রাখবার অঘোষিত বিধান আছে। বন্ধুবান্ধবেরা প্রথম তিনমাস আহা উঁহু করে যে যার যার মতো ব্যস্ত হয়ে গেছে। না, আমি তাদের দোষ দেইনা। যান্ত্রিক নগরীতে প্রতিযোগিতার সাথে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে হলে পঙ্গু মানুষ কোলে নিয়ে আদিখ্যেতা দেখালে হবেনা।

বাস্তবতা কাকে বলে খুব বুঝে গিয়েছিলাম। সেদিন তিথির ছোটভাই যাকে আদর করতাম অকৃত্রিমভাবে, সে ফোন দিয়ে বললো, আপির একটা মেয়ে হয়েছে। দুলাভাই একটু নারাজ, ছেলে চেয়েছিলো। আমার গলায় বাষ্প জমেছিলো তখন। বলতে পারিনি, তোর আপি আর আমি মিলে ঠিক করেছিলাম আগে একটা মেয়ে হবে আমাদের। দুই ঝুঁটি দুলিয়ে সারা ঘর দাপিয়ে বেড়ানো আশীর্বাদের পুটলিটার নাম রাখবো রিমঝিম।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.