তারপর একদিন অঙ্কিতা কেমন করে যেন বদলে গেলো

 তারপর একদিন অঙ্কিতা কেমন করে যেন বদলে গেলো

তাইমুর মাহমুদ শমীক : ফোন দিলে বলতো, খুব মাথার যন্ত্রণা করছে। রাখি এখন। কিছু মনে করোনা তুমি। আমি কিছু মনে করতাম না। কেবল বুকটা খাঁ খাঁ করতো। লাইব্রেরিতে বসে পড়াশুনা করতাম। মনোযোগ ধরে রাখতে পারতাম না। আমার অঙ্কিতা আর আগের মতো নাই। সে এখন আর হাসিমুখে কথা বলেনা !
একটা প্রিয় জারুল গাছ আছে। ব্যক্তিগত কষ্টের কথা সবাইকে বলে বেড়ানো যায়না। জারুল গাছকে সময় নিয়ে সব বলতাম। সে কি বুঝতো কে জানে ! আমার তবু হালকা লাগতো ভেতরটা।
এই তথাকথিত উত্তরাধুনিক সময়ে এসে আমি অঙ্কিতা একজন আরেকজনকে কাগজে লিখে চিঠি দিতাম। ও বদলে যাবার পর আমি একাই দিতাম। উত্তর আসতোনা।
গ্রামে চলে গেলাম। সেখানে এক বন্ধুর বাড়ি। যথেষ্ট সমাদর করলো। রাতের বেলা সেখানে জোনাকির দেখা মেলে। বন্ধু আমাকে শিখিয়ে দিলো কি করে হাত দিয়ে জোনাকি ধরতে হয়। আমি অন্ধকার ঘরে মশারির ভেতর জোনাকি ছেড়ে দিলে আলোর নাচন শুরু হতো। দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যেতাম।
বাড়ির কাছেই নদী। ভাটার সময় ভেজা বালিতে অঙ্কিতার নাম লিখতাম। তারপর হৃদয় এঁকে তার বুক বরাবর একটা তীর বসিয়ে দিতাম। চারুকলায় এবং বাস্তবে সে আমাকে ভেদ করে গেছে !
গ্রামের মানুষ সরল। সন্ধ্যাবেলায় গল্প শুনতে আসতো। ততোদিনে গল্পকথক হিসেবে আমার বেশ নাম ছড়িয়েছে। সকালে একটা প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চাদের বাংলা পড়াতাম। ক্লাসরুমে ঢুকবার আগে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা থাকতো পাগলা স্যার। দেখে হাসতাম। সাহিত্য নিয়ে কথা বলতাম। সময়জ্ঞান মাথায় থাকতোনা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারা মনোযোগ দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করতো। তাদের পাগলা স্যারের দুর্বোধ্য এলেবেলে মাখনবিলাস কথা তাদের ভালো লাগতো বোধহয় !
ডিঙ্গি নৌকা চালানো শিখে ফেললাম। বুকের জমাট হাহাকারগুলো একটু একটু করে কেটে যেতে লাগলো। বিকালবেলা বাজারে গেলে সম্মান পেতাম। মানুষ এমন চোখে তাকাতো, সহজসরল খেয়ালি এই মানুষটা দ্বারা গ্রামের কোন ক্ষতি হবার আশঙ্কা নেই।
বন্ধু ইঙ্গিতে একদিন বললো, শহরের বিলাসীতা ছেড়ে মূর্খদের স্বর্গরাজ্যে পড়ে আছিস। এবার নিজের ঘরে ফিরে যা। আহত গলায় বলি, তোদের খুব বিপদে ফেলে দিয়েছি… নারে?
বন্ধু বহুবচন অনুভূতির মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মানুষ হিসেবে অভিমানী ছিলাম। পরদিন সকালে বাসে করে শহরে চলে যাই। যাবার আগে ছাত্রছাত্রীরা তাদের সাধ্যমত এটা সেটা দেয়। আমি ফিরিয়ে দিতে পারিনা। এই একেকটা উপহার দেবার পেছনে কি অসীম ভালোবাসাই না তাদের মনের ভেতরে কাজ করেছে !
অঙ্কিতার আজ গায়ে হলুদ। ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মোটা অঙ্কের বেতন পায়। বিয়ের পর বউকে নিয়ে উন্নত দেশে চলে যাবে। মরার দেশে, ধর্ষণের দেশে অঙ্কিতাকে থাকতে হবেনা।
অঙ্কিতাকে অবাক করে দিয়ে আমি তার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যাই। অঙ্কিতা কখনো তার পরিবারের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। আত্মীস্বজনেরা আমাকে চিনতে পারেনা। কে জানে… চিনতে পারলে হয়তো ধরে বেঁধে পুলিশে দিয়ে দিতো। মামলা করতো ২০১৩ সালের সংশোধিত নারী নির্যাতন দমন আইনে !
বিরানীর স্বাদ ভালো ছিলো। ততোক্ষণে অঙ্কিতা পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, আমি তার খুব ভালো বন্ধু। আমি মেনে নিয়ে মন দিয়ে অশ্রুগ্রন্থিকে নিখুঁত শাসনে প্রসাদ খেতে থাকি। হঠাৎ পেছন থেকে একজন পিঠে হাত রাখে। তাকিয়ে দেখি অঙ্কিতার বাবা। আমাকে বলেন, তুমি সেই ছেলেটা না যে প্রায়ই টিএন্ডটিতে কল দিয়ে আমার মেয়েকে চাইতে? আমি নির্ভীকভাবে বলি, জ্বী !
উত্তর দিয়ে ঠাশ করে চড় খাই। মনের ব্যাথা গভীর থাকায় সে চড়ে কোন অনুভূতি হয়না। অঙ্কিতা দৌড়ে আসে। শাসন করে বলে, তোমার সাহস তো কম নয় বাবা? আমার বন্ধুর গায়ে হাত তুলেছো !
আমি নাটকের দৈর্ঘ্য বাড়তে না দিয়ে বিরানী লেগে থাকা হাত নিয়েই বিদায় নেই। আত্মীস্বজনের মাঝে ততোক্ষণে ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে।
হলুদের আগের রাতে অঙ্কিতা আমাকে মুঠোফোনে টেক্সট দিয়ে বলেছিলো, আগামীকাল আমার গায়ে হলুদ। তোমার জেদে তোমারই কপাল পুড়লো ! জানোতো… সকলের সাথে জেদ করতে নেই।
আমি অনেক ভেবেও কি জেদ তার সাথে করেছিলাম উত্তর বের করতে পারিনি। তবু চাপিয়ে দেয়া পাপের বোঝা মন থেকে কমাতে তার নতুন জীবন শুরু করার হলদে অনুষ্ঠানে তেলতেলে উন্নত চালের ভাত খেতে গিয়েছিলাম। সাথে খেলাম চড়।
বন্ধু নাঈমুল আমাকে সে রাতে বাইকে করে খুব ঘোরালো। মন ভরে চাঁদ দেখা যায় এমন একটা জায়গায় বাইকে পার্ক করে নরম গলায় বললো, মদ খা। ভালো লাগবে। আমি তাকে বললাম, আমাকে একটা জোনাকি এনে দিতে পারবি নাঈমুল? গা কাঁপিয়ে জ্বর আসছে। এখানেই কোন নীরব ফুটপাতে জায়গা ঠিক করে ধার করা মশারি টাঙ্গিয়ে দে। আমি চাঁদ আর জোনাকির আলোর নাচন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাবো।

mimmahmud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.