কেশব রায় চৌধুরী : গোমাংস বিতর্কে বহুজাতিক ভারতের রাজনীতির ময়দান বেশ উত্তপ্ত ও সরগরম এখন। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে গোমাংস নিয়ে বেশ কয়েকটি লজ্জাকর ও বিচ্ছিন্ন ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ভারতে এবার গোরু বিতর্কটা রূপ নিলো সমগ্রে। এবারকার বিতর্কটার শুরু, যখন গত ২৩শে মে তারিখে ভারতের কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় পশুর হাট থেকে জবাইয়ের উদ্দেশ্যে পশু কেনাবেচা নিষিদ্ধ (banning the sale of cattle for slaughter in animal markets) করে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে।

বিজ্ঞপ্তি জারির পর থেকেই তুমুল ঝড় চলছে সমগ্র ভারতজুড়ে। গো-রক্ষা আন্দোলনকারীরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয় বিভিন্ন রাজ্যে। অনাকাঙ্ক্ষিত লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটে এর মধ্যে বেশ কয়েকটি। প্রতিবাদে কোথাও চলে ‘গোমাংস উৎসব’, আবার কোথাও চলে ‘প্রকাশ্যে বাছুর কাটা উৎসব’। ‘দেশের বহুত্ববাদের উপর আক্রমণ’ উল্লেখ করে কয়েকটি রাজ্য সরকার বিজ্ঞপ্তিটির প্রতিবাদ করেছে বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই। আবার সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে এই বিতর্ককে শেষমেশ নিয়ে যাওয়া হয় আদালতে। সেখানেও তথৈবচ অবস্থা। একেক রাজ্যের হাইকোর্ট থেকে আসছে একেক রকম আদেশ। সব মিলিয়ে এটাই দৃশ্যমান যে, গোমাংস বিতর্কে বিভক্ত আজ পুরো ভারত।

কেন্দ্রীয় সরকারের এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট পিটিশন খারিজকালে গত ৩১শে মে তারিখে কেরালা হাইকোর্ট বলছে যে, বিজ্ঞপ্তিটিতে কোথাও গোরুর মাংস খাওয়া কিংবা গবাদিপশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়নি, কেবল বলা হয়েছে যে, পশুর হাটে জবাইয়ের জন্য পশু কেনাবেচা করা যাবে না। কেরালা হাইকোর্ট এও বলেছে যে, বিজ্ঞপ্তিটির দ্বারা নিজের বাড়িতে বা অন্য কোথাও পশু জবাই করে সেই মাংস খাওয়ার উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি।

আবার, একই দিনে রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরের একটি গোশালার অব্যবস্থাপনা নিয়ে পশু অধিকার কর্মী গৌরী মৌলেখী কর্তৃক ২০১৪ সালে দায়ের করা এক রিটের রায়ে রাজস্থান হাইকোর্টের বিচারপতি মহেশ চন্দ্র শর্মার একক বেঞ্চ বলেন যে, কৃষিপ্রধান ভারতের সংবিধানের ৪৮ ও ৫১এ(জি) অনুচ্ছেদের আলোকে বাঘ নয় বরং গোরুকেই ভারতের জাতীয় পশুর মর্যাদা দেওয়া উচিত এবং গো-হত্যার শাস্তি তিন বছর থেকে বাড়িয়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড করা প্রয়োজন। তিনি রায় ঘোষণাকালে আদালতে বলেন যে, “এ আমার, আপনার সকলের আত্মার ডাক। আইনের উৎস তো ধর্ম। উল্টোটা নয়”। বিচারপতি মহেশ চন্দ্র শর্মার এদিন ছিল অবসরে যাওয়ার আগে শেষ কর্মদিবস। আবেগাপ্লুত তিনি বিস্ময়করভাবে আদালতের বাইরে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের বলেন, “গো-হত্যার চেয়ে জঘন্য অপরাধ আর কিছুই হতে পারে না। গোরু আমাদের মায়ের মতো।’’ রাজস্থান হাইকোর্টের এই পরামর্শমূলক রায়ের পর জাতীয় পশু হিসেবে বেশ নড়বড়ে হয়ে ওঠেছে বাঘের আসন। চারদিকে টিটকারি-টিপ্পনী চলছে এই যে, “গোরুর দাপটে কি এবার আসনহারা হচ্ছে বাঘ?”

যদিও গৌরী মৌলেখীর আবেদনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ভারত থেকে নেপালে গোরু পাচার বন্ধ করা। কারণ একটি ধর্মীয় আচারের জন্য পাচার হওয়া সেই গোরুগুলোকে সেখানে বলি দেওয়া হতো। কিন্তু আদালত মামলাটিকে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করেন। যার সূত্র ধরেই কেন্দ্রীয় সরকার চর্চিত বিজ্ঞপ্তিটি জারি করে যে, গোমাংসের জন্য গবাদি পশুর হাট থেকে গোরু-মহিষ-উট ইত্যাদি কেনাবেচা করা যাবে না।

তবে, গৌরীর মতে সরকারের নির্দেশিকাটির ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘নতুন নির্দেশিকাটি কারো খাদ্যাভ্যাসের উপর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়। নতুন নিয়মের কোথাও বলা হয়নি যে গোমাংস খাওয়ার জন্য গবাদি পশু কেনাবেচা করা যাবে না। শুধু বলা হয়েছে যে, গো-হত্যার জন্য কৃষিবাজার থেকে গোরু-মহিষ ইত্যাদি কেনা যাবে না। কিন্তু পশু-খামার থেকে সরাসরি কেনা যেতেই পারে। সেখানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।” সরকারের তরফ থেকেও গৌরী মৌলেখীর মতো প্রায় এরকম বলা হচ্ছে এখন।

এদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে এক আইনজীবীর জনস্বার্থে দায়ের করা অপর এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে মাদ্রাজ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ভারতের ফেডারেল সংবিধানের মূল কাঠামোতে আঘাতের যুক্তিতে গত ৩০শে মে তারিখের এক অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের এই নির্দেশনাকে চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন। এই রিটে আবেদনকারীর প্রধান যুক্তি ছিল যে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা ‘Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960’ এর ২৮ ধারার সাথে সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা হয়েছে যে, ধর্মীয় আচারের উদ্দেশ্যে পশু নিধন শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। তাঁর যুক্তি ছিল যে, যেহেতু সংবিধানের চেতনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত মূল আইন ধর্মীয় কারণে পশু কেনাবেচা বা জবাইকে সিদ্ধ করেছে সেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের এরূপ নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনানুগ কোনো এখতিয়ার নেই। তাঁর আরো যুক্তি ছিল যে, ভারতীয় সংবিধানে নিশ্চয়তা প্রদানকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার অধিকারের সাথে এই বিধি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তিনি আদালতে বলেন, খাওয়ার জন্য পশু জবাই এবং ধর্মীয় উপাসনালয় বা স্থানে পশু উৎসর্গ করা সমগ্র ভারতের অধিকাংশ সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি আরো বলেন, এ সকল বিষয়ে কেন্দ্র নয় বরং রাজ্য সরকারই কেবল প্রতিটি রাজ্যে উপযুক্ত বিধান প্রণয়ন করতে পারে।

কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ছুতায় চর্চিত নিষেধাজ্ঞাটি জারি করেছে। যদিও ভারতের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের একমাত্র উপজীব্য বিষয় হচ্ছে যে, কৃষিপ্রধান ভারতের কৃষি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সরকার পশু উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সে লক্ষ্যে পশু জবাই নিষিদ্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। ভারতীয় সংবিধান গ্রহণকালে ১৯৪৮ সালের ২৪শে মে তারিখে এই অনুচ্ছেদের খসড়ার উপর অনুষ্ঠিত এক সংসদীয় বিতর্কে কৃষি বিষয়ক উন্নয়নের দিক ছাড়াও ধর্মীয় ভাবাবেগের বিষয়টিও প্রবলভাবে ওঠে আসে। এমনকি গোরক্ষার বিষয়টিকে মৌলিক অধিকার অংশে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও ওঠেছিল সে সময়। কিন্তু মৌলিক অধিকার কেবলমাত্র মানুষের বেলায় প্রযোজ্য, পশুর বিষয়ে নয়- এই প্রশ্নে সে দাবি তখন ধোপে টেকেনি।

যাই হোক, ওই সংসদীয় বিতর্কে শেষ পর্যন্ত এই নিরসন হয় যে, পশু জবাই বিশেষ করে গোরু জবাই নিষিদ্ধকরণ এবং শিথিলায়নের বিষয়টি কেবলমাত্র রাজ্য সরকারের নিরূপণেরই এখতিয়ারাধীন হবে। অর্থাৎ বহুজাতিক ভারতের রাজ্য সরকারই সে রাজ্যের জনগোষ্ঠীর ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার ও ভাবাবেগের বিবিধতার উপর দৃষ্টি রেখে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করবে, কোনোভাবেই কেন্দ্রীয় সরকার সমগ্র ভারতের জন্য কোনো একক জীবনাচার চাপিয়ে দিবেন না। নানা ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার এবং বিশ্বাসের একটি দেশের জন্য ঠিক এই সকল কারণেই দূরদর্শী সংবিধান প্রণেতাগণ এরূপ একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্ণয় করে দিয়েছেন সে সময়।

ভোটের রাজনীতির কুটিল হিসাবে থেকেই হোক আর ফেডারেল সংবিধান রক্ষার যুক্তিতেই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের ফেডারেল কাঠামো ক্ষুন্নের সেই অভিযোগটাই তুলে বলেছেন যে, তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের এই নির্দেশনা মানবেন না। এক কাঠি বেড়ে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী বিজ্ঞপ্তিটির প্রতিবাদে সকল মুখ্যমন্ত্রীদের বসার ডাক দিয়েছেন। তাছাড়া কর্নাটক সরকার এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সরকারেরও মনোভাব প্রায় একই রকম। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছে বিভিন্ন রাজ্যজুড়ে এবং ক্রমাগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠছেন প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ বিজেপি ও তার মিত্র সংঘ পরিবার।
যৌক্তিকভাবেই বলা চলে যে, বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি, বহু আচার, বহু বিশ্বাস এবং বিবিধ সামাজিক প্রবাহের একটি দেশে কেন্দ্র থেকে কোনো একমাত্রিক জীবনচর্যা চাপিয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন বা ব্যবহারিক জীবনের ছাঁচটাকে একমাত্রিক বা সরলরৈখিক করে তোলা সম্ভব নয় কিছুতেই। একজন নাগরিক কোন ভাষায় কথা বলবেন, কোন ধরনের খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত হবেন, কোন পোশাকে রুচি বোধ করবেন ইত্যাদি নিরূপণ করা রাষ্ট্রের কাজও নয়। তারপরও ভারতবাসী কেউ গোমাংস খাবেন কি খাবেন না, তা নিয়ে চলছে বিতর্ক বিস্তর, মাঠে-ময়দানে। শেষমেশ আদালতের কাঠগড়া পর্যন্ত গিয়েছে সে লড়াই।

কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ এবং ‘Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960’ এর দোহাই দিলেও কৃষিস্বার্থ রক্ষার ঠোঙায় গোমাংস বিতর্ককে কেবল ধর্মীয় ভাবাবেগ থেকেই জিইয়ে রাখা হচ্ছে দিনের পর দিন, যদিও কৃষিকার্যে লাঙল টানার গোরুর গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি অনেক আগেই বহুলাংশে দখল করে নিয়েছে মাহিন্দ্র বা টাটার আধুনিক ইস্পাতের ফলা। ফলে এখনকার বিতর্কটা মোটেই কৃষিপ্রধান ভারতের কৃষি উন্নয়নে গবাদি পশু সুরক্ষা এবং সংরক্ষণের উদ্দেশ্য থেকে নয় বরং পুরো বিষয়টির অন্তরালে টগবগ করছে সাম্প্রদায়িক সেন্টিমেন্ট, যেটা হচ্ছে সব থেকে ভয়ংকর।

এই সাম্প্রদায়িক সেন্টিমেন্টের আঘাত অবধারিত গিয়ে ঠেকছে বহুজাতিক ভারতের অসাম্প্রদায়িক ভিতে। অশৌচ হচ্ছে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক ভারতের পূত-পূতাত্মা। সঙ্গে গোঁড়া ও রক্ষণশীল এক তকমা আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে যাচ্ছে প্রাচীন এই ধর্মটার গায়ে। বর্ণিল ভারত আর এই ধর্মটার এই দীনতা ঘোচাবে কে?

সেক্যুলার ভারত জাতির বহুমাত্রিক চরিত্রের হালটাকে যারা ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করছে, তাদের বিপরীতে কেউ কি আজ ভারতের এই সংকটের পথের কান্ডারি হবে? সম্ভাবনার ছিটাফোঁটা আভাসও মিলছে না দৃষ্টির সম্মুখে। সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে কৌশলগত কারণে। তারা ভারতকে বিশ্বাসবন্ধনের শিথিলতায়, ভাতৃবিদ্রোহে এবং সর্বপ্রকার ভ্রষ্টতার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে জেনেও ভোটের জটিল সমীকরণের কথা মাথায় রেখে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানভঞ্জনের পাপে লিপ্ত হতে কেউ রাজি নয় আর। ঠিক একই কারণে এবং একই ভাবে স্ব স্ব ধর্মের উপর ভর করে উগ্রবাদের ফণা তুলে ছোবল মারতে উদ্যত আজ গোটা বিশ্ব। তা থেকে পথ বাতলানোর কেউ নেই আজ, বরং টেনে নিয়ে চলেছে পিছনে ক্রমাগত। ফলে নিরসনের গুরুভারটা কাঁধে তুলে নিতে হবে সম্ভবত ঈশ্বরকেই।
লেখক : ডেপটি রেজিস্টার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যনাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.