মাসকাওয়াথ আহসান :

কোন সরকারী পদক্ষেপে সংক্ষুব্ধ জনতা কতটুকু ক্রোধ প্রকাশ করতে পারবে; অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে ও ভরসা রেখে কীভাবে তা প্রকাশ করতে হবে; এ সংক্রান্ত দিক নির্দেশনা সম্বলিত একটি নীতিমালা প্রণীত হতে যাচ্ছে।

ভরসা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে “প্রতিবাদ নীতিমালা ২০১৭”-র খসড়া অনুমোদিত হয়। এই খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবাদ জানানোর ক্ষেত্রে সুর্নিদিষ্ট কিছু শ্লোগান ব্যবহার করতে পারবে সংক্ষুব্ধ জনতা। যদিও জনতার সংক্ষুব্ধ হবার আদৌ কোন কারণ আছে কীনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কমিটির কয়েকজন সদস্য।

কমিটির একজন সদস্য বলেন, উন্নয়নের এই মধুর বসন্তে জনতার সংক্ষুব্ধ হওয়া খুবই অযৌক্তিক; আছিস সুখে আবার এতো প্রতিবাদ কেনরে বাবা! তবু একান্ত যদি কোন প্রতিবাদ জানাতেই হয়; তাহলে নীরবে বেলুন উড্ডয়ন ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলনই যথেষ্ট হওয়া উচিত। আর মূকাভিনয়ের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাও হে প্রজাসকল।

অপর সদস্য মন্তব্য করেন, জনতাকে সুখে থাকতে ভুতে কিলায়; এমন অপার সুখে পৃথিবীর আর কোন দেশের মানুষ আছে কী! আসলে আমরা দাঁত থাকিতে দাঁতের মর্যাদা বুঝিতে চাহিনা। আর কিছু সংখ্যক বামাতী সারাক্ষণ তিতা করলা খেয়ে নিজেদের মুখ তিতা করে রাখে; তিতা কথা বলে জনতার মন তিতা করে তোলে। কিন্তু জনতার উচিত ধৈর্য্য ধরতে শেখা; কারণ অপেক্ষার ফল খুবই সুমিষ্ট হয়।

এই প্রতিবাদ নীতিমালা সম্পর্কে একজন ভরসাবিদ বলেন, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর পদগুলো যেহেতু সাংবিধানিক তাই তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সময় শ্রদ্ধা-ভক্তি সহযোগে মাননীয় বলা আইনানুগ। এর অন্যথা হলে তা সংবিধানের স্পষ্ট অবমাননা।

একজন বামাতী প্রশ্ন তোলেন, এতোকাল যেভাবে প্রতিবাদ হয়েছে; এখন তার অন্যথা কেন! পৃথিবীর সব দেশেই প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীর পদ সাংবিধানিক; তাই বলে তাদের মহোদয় বলে পুতুপুতু করে কোন প্রতিবাদ কাউকে করতে দেখিনা। এখানে তার অন্যথা কেন!

ভরসাবিদ এর জবাব দিয়ে বলেন, কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা! অন্য কোন দেশে এমন ভরসায় স্নাত প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী আছে নাকি! ব্যাপারটা বুঝতে হবে। এই মহাত্মনদের সঙ্গে অন্যান্য দেশের ভরসা বিমুখ নীতি নির্ধারকদের তুলনার কোন প্রশ্নই আসে না। ইহাদিগের তুলনা কেবল ইহাদিগের সঙ্গেই চলে। অন্যদেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করে ইহাদিগের অবমাননা করা সঠিক নয়। এতে দেশপ্রেমিকদের অনুভূতি খুবই আঘাত প্রাপ্ত হয়।

“প্রতিবাদ নীতিমালা” ২০১৭-র খসড়ায় অনুমোদিত শ্লোগানগুলো হচ্ছে,

–মাননীয় ও মাননীয়, চক্ষের নজর এমনি কইরা একদিন বইয়া যাবে; জোয়ার ভাটায় পইড়া দুইচোখ নদী হইয়া যাবে।

–মাননীয়, যেখানে বসন্ত আমার; সেখানে সীমান্ত তোমার।

— আমার সারাদেহ খেও গো মাননীয়, এই চোখ দুটো মাননীয় খেও না; আমি টিয়ার শেলের ঝাঁঝে মাননীয় বাঁচবো না গো বাঁচবো না।

–আমারো পরানো যাহা চায়; তুমি তাই তুমি তাই গো মাননীয়।

–ও মালিক সারাজীবন কাঁদালে যখন, আমায় ভাঁড় করে দাও; এবার ভাঁড় করে দাও; যেন হাসতে পারি মনের সুখে; অনেক ভালো তাও।

–আছেন আমার মিনিস্টার; আছেন আমার প্রাইম মিনিস্টার, শেষ বিচারের হাইকোর্টেতে তিনি আমায় করবেন পার; আমি পাপী তিনি জামিনদার।

–না-ই না-ই; এ আঁধার থেকে ফেরার পথ নাই।

এই সরকার অনুমোদিত শ্লোগানের তালিকা সম্পর্কে একজন প্রতিবাদকারী প্রশ্ন তোলেন, সরকার দলীয় কর্মীরা এতো অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে; অথচ আমাদেরকেই কেন গালির বিপরীতে তালি দিয়ে এমন পেলব প্রতিবাদ করতে হবে।

ভরসাবিদ এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেন, অশ্লীলতা ক্ষমতাসীনদের প্রাধিকার; আর সুমিষ্টতা ক্ষমতাহীনদের অধিকার। সর্বংসহা না হলে আদর্শ প্রতিবাদী হওয়া যায়না। আর বামাতীদের মনে রাখা প্রয়োজন পলিটিকস শব্দটি এখন মনোপলিটিকস। সুতরাং গালিগালাজের মনোপলি কেবল ক্ষমতাসীনদের।

বামাতী নসিহতকারী ভরসাবিদকে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, আমরা নাহয় বামাতী আর আপনারা যে হেফাজতী; কীসের এতো বড়াই হে!

ভরসাবিদ ধমক দিয়ে বলেন, ভদ্র ভাষায় বলতেছি বলে কথা গায়ে লাগতেছে না দেখতেছি; “সেলিম ওসমান ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্সটিটিউটে”র ভাষায় কইলে তখন বুঝবা। আমরা দেশপ্রেম ও অনুভূতির পাহারাদার। এইগুলি হেফাজত করা আমাদের কর্তব্য। খবরদার আর রাজপথে যেন না দেখি। শুধু ফেসবুকে থাকবা; আমরা যেইভাবে বলি; ঠিক সেইভাবে মাইপা প্রতিবাদ করবা। নাইলে “খেলা হবে”।

সরকারের নবরত্ন সভার একজন বুদ্ধিজীবী মন্তব্য করেন, সবই মূল্যবোধের অবক্ষয়। প্রতিবাদের ভাষা এতো দুর্বিনীত হবে কেন! হে তারুণ্য তোমরা হারমোনিয়াম পার্টি হও। প্রয়োজনে ছায়ানটে ভর্তি হয়ে পেলবতার অনুশীলন করো। ভাষ্কর্য স্থানান্তরের প্রতিবাদে বরং সুরে সুরে বলো, আজি কী তোমার মধুর মুরতি হেরিনু শারদ নিশিথে!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.